মাদক-জুয়ায় নিষেধ করায় রক্তাক্ত আরিফুল, ৮ দিনেও ফেরেনি জ্ঞান

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: মাদক ও অনলাইন জুয়ার প্রতিবাদ করায় লালমনিরহাটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরিফুল ইসলাম (৩৪) নামে এক কলেজ শিক্ষক। টানা ৮ দিন ঢাকা এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসায়ও জ্ঞান ফেরেনি তার।

কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইসলাম লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে। তিনি লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাদক-জুয়া-বাল্যবিয়েসহ নানা সামাজিক অপরাধ দমনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আলোকিত লালমনিরহাট নামে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এ সামাজিক আন্দোলনের কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার। ওয়ার্ড থেকে মুল কমিটিতে শিক্ষকসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক আরিফুল ইসলাম নিজ জন্মস্থান ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের মাদক ও জুয়া চক্রকে সতর্ক করেন এবং এসব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। তার গ্রামের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে ওই গ্রামের হাসান আলী, মেহেদী হাসান, পারভেজ, মমিন মিয়া ও হৃদয় মিয়াসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি বড় অনলাইন জুয়া পরিচালিত হচ্ছে। এ খবরে তাদের ডেকে নিয়ে সতর্ক করে এসব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইসলাম। সরে না এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করার ঘোষণা দেন তিনি। সমাজ থেকে সামাজিক অপরাধ দমনের এ ঘোষণাই  কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য।

গত ১ আগস্ট প্রতিদিনের মতো কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন আরিফুল ইসলাম। এ সময় আগে থেকে ওত পেতে থাকা রহিদুলের নেতৃত্বে জুয়া চক্রটি দেশি অস্ত্রে নিয়ে শিক্ষক আরিফুলের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আরিফুলের মাথায় কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। পরে স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় আরিফুলকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। সেখানে অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা ৮ দিন ধরে চিকিৎসা করেও জ্ঞান ফিরেনি আরিফুলের। হাসপাতালের আইসিইউ বেডে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন কলেজ শিক্ষক আরিফুল।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার আরিফুলের গর্ভবতী স্ত্রী ক্লিনিকে অস্ত্রোপচর করে ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। সমাজ আলোকিত করতে গিয়ে কলেজ শিক্ষক আরিফুলের পরিবার আজ দিশেহারা। অসুস্থ স্ত্রী আর সন্তানের পাশে থাকার কথা যে শিক্ষক আরিফুলের, তিনি নিজেই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক ওই গ্রামের একাধিক ব্যক্তি বলেন, রহিদুলরা চিহ্নিত জুয়াড়ি। তাদের চক্রে পড়ে এলাকার যুবকরা জুয়ায় সহায় স্বিল বিনষ্ট করে পথে পথে ঘুরছে। অনেকেই বাড়ি গাড়ি বিক্রি করে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। জুয়াড়ি রহিদুলদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে মিথ্যা মামলা বা হামলা করে। তাই কেউ প্রতিবাদ করে না। আরিফুল শুধু তাদের নয়, সামাজিক অপরাধে জড়িতদের সতর্ক করে ভালো পথে ফেরার আহবান জানান। এটাই কাল হয়েছে তার। জুয়ার প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যার জন্য কুপিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে জুয়াড়ি চক্রটি।

শিক্ষক আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে পরদিন ২ আগস্ট রহিদুলকে প্রধান করে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় আটজন আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে তার পরিবারকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রধান অভিযুক্ত রহিদুল পলাতক থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

শিক্ষক আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ৮ দিন ধরে আইসিইউতে মৃত্যুর প্রহর গুনছে ছেলে। অপর দিকে ২ দিন ধরে ওই ছেলের বউ ক্লিনিকে সিজার করে ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। দুই দিকে দুই রোগী মাঝে আসামিদের হুমকিতে পরিবার নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কায় রয়েছি। সমাজকে আলোকিত করতে গিয়ে আজ আমার ছেলে অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

আদিতমারী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা অভিযোগটি তদন্ত করে নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেছি। মূল অভিযুক্ত পলাতক থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম