বাইশটিলায় গড়ে উঠছে নতুন পর্যটন হাব

শফিক আহমদ শফি, সিলেট: প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সিলেটকে আরও আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সিলেট জেলা পরিষদ। এর অংশ হিসেবে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন বাইশটিলা ন্যাচারাল পার্ককে ঘিরে নেওয়া হয়েছে বড় পরিসরের পর্যটন মহাপরিকল্পনা। প্রাকৃতিক টিলা, জলাশয় ও বিদ্যমান ভূপ্রকৃতি অক্ষুণ্ন রেখে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলাই এ পরিকল্পনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, সিলেট সদর উপজেলার বাইশটিলার বিদ্যমান প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে পর্যটকদের জন্য দিনব্যাপী অবকাশযাপন ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে একটি টিলা ও এর আশপাশের জলাশয়কে কেন্দ্র করে পর্যটকসেবা অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রকল্পটির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

জেলা পরিষদের মালিকানাধীন প্রায় ৪৩ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে পাঁচটি টিলা ও একটি জলাশয়। এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করেই ন্যাচারাল পার্কের উন্নয়নকাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্পের নকশায় টিলা কেটে সমতল করার পরিবর্তে বিদ্যমান ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে পর্যটন সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে একটি বিচ্ছিন্ন টিলাকে। টিলাটির চূড়ায় ও ঢালে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা, ছাউনি এবং প্রকৃতিনির্ভর অবকাশযাপনের জন্য কটেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। জলাশয়ের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাওয়ার জন্য ঘাট ও নৌযানের ব্যবস্থা থাকবে। টিলায় ওঠার জন্য নির্মাণ করা হবে সিঁড়ি। পাশাপাশি পর্যটকদের সুবিধার জন্য কিচেন, রেস্টরুম এবং মাছ ধরার মতো বিনোদন সুবিধাও রাখা হবে।

জেলা পরিষদ সূত্র আরও জানায়, প্রথম ধাপের কাজ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে পুরো বাইশটিলা এলাকাকে একটি সমন্বিত পর্যটন হাবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানে টিলাগুলো ঘিরে ক্যাবলকার, শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড ও খেলার ব্যবস্থা, ফুডকোর্ট, অ্যাম্ফিথিয়েটার, মেলার স্থান, রিসোর্ট, পার্কিং ও রেস্টরুমসহ বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব সুবিধা বাস্তবায়িত হলে বাইশটিলা সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সিলেটের পর্যটনকে দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জেলার পাহাড়, টিলা, ঝরনা, হাওর, বন ও চা-বাগানকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করার সুযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের জেলা-ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনাতেও পর্যটন শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলার এবং জেলার বাইরের মানুষের বিনোদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বাইশটিলা ঘিরে এ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জেলা পরিষদ।

সিলেটে বর্তমানে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে একাধিক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেল ও পর্যটন ম্যাপও রয়েছে। ফলে জেলা পরিষদের নতুন উদ্যোগের সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা গেলে পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে দেশের বাইরে থাকা অনেক মানুষ দেশে ফিরলে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটানোর জন্য শহরের কাছাকাছি মানসম্মত বিনোদনকেন্দ্রের প্রয়োজন অনুভব করেন। শহরতলিতে এ ধরনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিনোদনকেন্দ্রের ঘাটতি রয়েছে। জেলা পরিষদের বাইশটিলা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের এ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্যও নতুন বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হবে। এর মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটের পর্যটন উন্নয়নে প্রকৃতি ও অবকাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে টিলা, জলাশয়, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পর্যটন অবকাঠামো তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃতির ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই বাইশটিলা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাশয় সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম বলেন, সিলেটের পর্যটন সম্ভাবনা বহুদিনের। এখন সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই জেলা পরিষদের বাইশটিলা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে সিলেটের পর্যটনে নতুন রূপ লাভ করবে। এর ফলে বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় শুধু একটি নতুন পর্যটন গন্তব্য তৈরি হবে না, বরং সিলেটের পর্যটন নতুন উচ্চতায় আসীন হবে।

জেলা পরিষদের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সিলেটে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।