চলতি বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মো. সামীমুজ্জামান। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে দেশের পর্যটন খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন দৈনিক জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার সৈয়দ ইকবাল।
জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমান সরকার অর্থনীতির গতি বাড়াতে অনেক ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
সামীমুজ্জামান: বর্তমান সরকার পর্যটন শিল্পকে যে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইশতেহারের পর্যটন অংশে পর্যটকবান্ধব ভিসা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক ট্রাভেল অ্যাপ চালু, দক্ষ ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন, জেলাভিত্তিক কমিউনিটি ট্যুরিজম, প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে ইকোট্যুরিজমের বিকাশ, নদী বা জলভিত্তিক পর্যটন এবং রন্ধনশিল্পভিত্তিক পর্যটন বা কুলিনারি ট্যুরিজমের প্রসার, গ্রামীণ পর্যটন ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাভিত্তিক পর্যটন বা এথনিক ট্যুরিজমের বিকাশ এবং ‘ঢাকা ফুড অ্যান্ড কালচার ফেস্ট’ আয়োজনের মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যেও সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের পর্যটন-সংক্রান্ত পাঁচটি মূল অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো— পর্যটক নিরাপত্তা ও পর্যটনবান্ধব নীতি প্রণয়ন, ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ, কুলিনারি ট্যুরিজম সম্প্রসারণ, কমিউনিটি, এথনিক ও ওয়াটার ট্যুরিজমের বিকাশ এবং ইকোট্যুরিজম ও রুরাল ট্যুরিজমের উন্নয়ন।
পর্যটনকে বর্তমান সরকার কেবল বিনোদন বা অবকাশ যাপনের মাধ্যম হিসেবে দেখছে না; বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশের পর্যটন শিল্পকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একইসঙ্গে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে ইনভেস্টমেন্ট রোডম্যাপ, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন প্রশিক্ষণ, ইন্টারন্যাশনাল হসপিটালিটি বেঞ্চমার্ক, ঐতিহ্য ও ইকোট্যুরিজম উন্নয়ন এবং একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সামীমুজ্জামান: আমার দৃষ্টিতে এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বিত পরিকল্পনাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে পর্যটন ও পর্যটকবান্ধব মানসিকতা ও স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা। বিশেষ করে বিমানবন্দরের দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনায় বিদেশি পর্যটকদের সেবা উন্নত করা, মহাসড়কগুলোকে জ্যামমুক্ত ও সুশৃঙ্খল রাখা, যাতায়াত ও পর্যটন গন্তব্যে পর্যটকদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উন্মুক্ত আবর্জনা অপসারণ এবং যথাযথ বর্জ্য রিসাইক্লিং ব্যবস্থা চালু করা, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন ও বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপন করা এসব বিষয় এখনও আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। এছাড়া বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আন্তঃমন্ত্রণালয়, আন্তঃবিভাগ এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যটন অংশীজনদের মধ্যে সুসমন্বয় রক্ষা, গণমাধ্যমে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বা ব্র্যান্ডিং জোরদার করা, পর্যটন শিল্পে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের অপ্রতুলতা ও বাধাসমূহ দূর করা এবং পর্যটন গন্তব্যের স্থানীয় জনসাধারণকে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যটন কার্যক্রমে যুক্ত করাও বেশ বড় চ্যালেঞ্জ।
আমাদের প্রাকৃতিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের কোনো ঘাটতি নেই; ঘাটতি রয়েছে কেবল উন্নত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা, নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, মানসম্মত সেবা, আন্তর্জাতিক প্রচার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সমন্বয়ের।
জাতীয় অর্থনীতি: পর্যটকদের নিরাপত্তায় নতুন কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?
সামীমুজ্জামান: পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ ভ্রমণ পরিবেশ। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারেও পর্যটকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল ও কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা, মানসম্মত পর্যটক সেবা, গাইডদের জন্য পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আচরণবিধি প্রণয়নের বিষয়গুলো মহাপরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে নতুন পর্যটনকেন্দ্রগুলো যখন পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে, তখন নিরাপত্তা, জরুরি সেবা ও ভিজিটর ম্যানেজমেন্টকে এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে, পর্যটন খাতের পেশাদারদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের পর্যটকদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গত ৫২ বছর ধরে পর্যটন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ করে আসছে এবং এই কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে। পর্যটকের নিরাপত্তায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর হলো পর্যটন গন্তব্যে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে জেলাভিত্তিক পর্যটন গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে, যা মূলত কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমের আদলে বাস্তবায়িত হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: দেশের বিদ্যমান যোগাযোগ অবকাঠামো কি পর্যটন সহায়ক মনে করেন?
সামীমুজ্জামান: দেশের সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থায় গত কয়েক দশকে যে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে তা পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে পর্যটনকেন্দ্র পর্যন্ত লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি, বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা, সাইনেজ, নিরাপদ সড়ক নেটওয়ার্ক, মানসম্মত গণপরিবহন এবং পর্যটকবান্ধব অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। এ কারণেই সরকার পর্যটন মহাপরিকল্পনায় অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর ও বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন ও ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন যোগাযোগ নির্বিঘ্ন করা হয়েছে এবং ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: ১ হাজার ৪৯৮ স্পটের মহাপরিকল্পনা কবে বাস্তবায়ন হবে?
সামীমুজ্জামান: দেশের সম্ভাবনাময় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটনকেন্দ্র চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ বর্তমানে দ্রুত এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি ‘জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মহাপরিকল্পনা চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হওয়ার পর প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের সম্ভাবনা, পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, অবকাঠামোগত সুযোগ এবং বিনিয়োগের ধরন বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল, জয়পুরহাট ও নাটোরে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করেছে এবং খসড়া ডিপিপিও তৈরি করা হয়েছে। চট্টগ্রামের পারকিতে রিসোর্ট নির্মাণকাজ সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এছাড়া হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা সেতু সংলগ্ন এলাকা এবং পঞ্চগড়ে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: নতুন পর্যটন নীতিমালায় মূল গুরুত্ব কী?
সামীমুজ্জামান: প্রস্তাবিত ‘জাতীয় পর্যটন নীতিমালা-২০২৬’-এর মূল লক্ষ্য হলো একটি বাস্তবভিত্তিক, বিনিয়োগবান্ধব, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা। এই নীতিমালার মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্রের পরিকল্পিত উন্নয়ন, বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ, পর্যটন খাতে পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কার্যক্রম জোরালো করা, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধান, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন, ইকোট্যুরিজম এবং আধুনিক পর্যটন সেবা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে নীতিমালার তাত্ত্বিক দিক ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে আরও ফলপ্রসূ করার বিষয়টিও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
জাতীয় অর্থনীতি: স্থানীয় মানুষকে কীভাবে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়?
সামীমুজ্জামান: পর্যটনের সুফল দেশের প্রান্তিক ও স্থানীয় মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন বা ‘কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম’কে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যটন আবাসন, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য পরিবেশন এবং স্থানীয় পরিবহনের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেন। স্থানীয় জনগণকে ট্যুর গাইড, হোমস্টে পরিচালনা, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, স্থানীয় খাবার সরবরাহ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, খুচরা ব্যবসা এবং গন্তব্য ব্যবস্থাপনা বা ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে ‘কমিউনিট ট্যুরিজম’-কে সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শুরুতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ন্যূনতম একটি গ্রামকে বেছে নিয়ে রাত-যাপনের সুবিধাসহ গ্রাম-পর্যটন গড়ে তোলা হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা হবে। এতে স্থানীয় মানুষকে পর্যটন শিল্পে উদ্যোক্ত হিসেবে যুক্ত করার জন্য সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট বোঝা যায়। সফলভাবে কমিউনিট বেজড ট্যুরিজম বাস্তবায়নের ফলে পর্যটকরা যেমন স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনধারার একটি খাঁটি ও অনন্য অভিজ্ঞতা লাভ করবেন, তেমনি স্থানীয় জনগণের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
জাতীয় অর্থনীতি: পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ রক্ষায় কী ব্যবস্থা থাকছে?
সামীমুজ্জামান: আমাদের দেশের নদী, জলাধার, সমুদ্র এবং বৈচিত্র্যময় প্রতিবেশ ও প্রকৃতিই হলো বাংলাদেশের পর্যটনের মূল প্রাণস্পন্দন। তাই পর্যটন শিল্পের স্বার্থেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে পরিবেশ সচেতন হতে হবে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে হবে। নতুন মহাপরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা, কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইকোট্যুরিজম, জলাভূমি ও হাওড় পর্যটন, উপকূলীয় পর্যটন এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবন অথবা পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর দ্বীপসমূহে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত রাখা হয় যাতে এসব স্থানে জীব-বৈচিত্র্য ও বাস্তু-সংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব সীমিত রাখা যায়।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন যেকোনো পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়ন বা নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, ধারণক্ষমতা বা ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ বজায় রাখা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কঠোরভাবে হ্রাসের বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করছে।
জাতীয় অর্থনীতি: বিদেশি পর্যটক বাড়াতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ কতটা ভূমিকা রাখবে?
সামীমুজ্জামান: আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী, আকর্ষণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ডেস্টিনেশন ব্র্যান্ড থাকা অত্যন্ত জরুরি। ২০১০ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে ‘রূপময় বাংলাদেশ’-কে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ড বা কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সময়ের প্রয়োজনে এই ব্র্যান্ডিংকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় এবং বাংলাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও বর্তমান সরকারের সৃজনশীল অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ শিগগিরই নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান, বিশিষ্ট ব্যক্তি, গণমাধ্যমকর্মী এবং পর্যটন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হবে।
বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংকে কেবল সমুদ্র সৈকতমুখী না রেখে বহুমুখী করে তুলতে হবে; কারণ আমাদের দেশে অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ, স্বকীয় চরিত্রের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং কৃষ্টি রয়েছে যা আলাদা করে প্রচার করা প্রয়োজন। একইভাবে প্রতিটি পর্যটন আকর্ষণের জন্য স্বতন্ত্র কৌশল নির্ধারণ করে প্রচারণা চালানো হবে। পাশাপাশি যেসব পর্যটন ব্লগার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করছেন, তাদের কার্যক্রমের সঙ্গেও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় করা হবে।
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে পর্যটন প্রচারণা, বিপণন ও যোগাযোগের বিষয়গুলো সুসংহত করা হবে। পাশাপাশি বিমানবন্দরে বিদেশি পর্যটকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা ফি মুক্ত বা ন্যূনতম করা এবং দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা সহজতর করার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ কোন পর্যায়ে গেছে?
সামীমুজ্জামান: বর্তমান সরকার পর্যটন খাতের টেকসই উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপকে (পিপিপি) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীন বিদ্যমান অবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোকে আধুনিকায়ন করে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য পিপিপি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিপিসির মোট ৫৪টি পর্যটন স্থাপনা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে কক্সবাজারের হোটেল শৈবালসংলগ্ন পর্যটন করপোরেশনের নিজস্ব জমিতে একটি বড় সমন্বিত পর্যটন কমপ্লেক্স উন্নয়ন, বাগেরহাট ও খুলনায় পাঁচ তারকা হোটেল এবং পর্যটন ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন এবং মহাখালীর ‘হোটেল অবকাশ’ ভেঙে সেখানে বিশ্বমানের তারকা হোটেল ও আধুনিক পর্যটন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ একটি সুবিশাল ট্যুরিজম হাব নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
এ সবের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং পর্যটকদের সেবার মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
জাতীয় অর্থনীতি: বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় কীভাবে করা হয়?
সামীমুজ্জামান: বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন যেহেতু সরাসরি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি জাতীয় পর্যটন সংস্থা, তাই মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত নিয়মিত, নিবিড় ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় রয়েছে। পর্যটন নীতিমালা প্রণয়ন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, পিপিপি কার্যক্রম পরিচালনা, পর্যটন প্রশিক্ষণ, প্রচারণা এবং বিপিসির সম্পদ ব্যবস্থাপনা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নীতিগত নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করে যাচ্ছি।