মোহাম্মদ শাহজাহান, খাগড়াছড়ি : পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা পর্যটকদের আনাগোনার সঙ্গে খাগড়াছড়িতে বাড়ছে স্থানীয়ভাবে তৈরি বাঁশ-বেতের সামগ্রী, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের চাহিদা। পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন দোকানে এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোক্তা, দক্ষ কারিগর ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকট রয়েছে। ফলে পর্যটকদের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করতে হচ্ছে জেলার বাইরের বিভিন্ন স্থান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের দোকানগুলোতে বর্তমানে বাঁশ-বেতের তৈরি ঝুড়ি, ট্রে, কাপ, মগ, পানির বোতল, ফুলদানি, টিস্যুবক্স, টেবিল ল্যাম্প, ব্যাগ ও নানা ধরনের শৌখিন সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক, তাঁতপণ্য ও বিভিন্ন নকশার কাপড়ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
পর্যটকেরা এসব পণ্য নিজেদের ব্যবহারের জন্য কেনার পাশাপাশি স্বজন ও বন্ধুদের উপহার হিসেবেও নিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে পর্যটনকে ঘিরে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনাও বাড়ছে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের একটি দোকানে কর্মরত সাহা জান্নাত বলেন, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে কাজ করছেন। পর্যটকদের মধ্যে কাপড়ের পাশাপাশি বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে বেতের তৈরি ঝুড়ি, বাঁশের তৈরি পানির বোতল, চুল বাঁধার কাঁকড়া এবং রেক্সিনের তৈরি ব্যাগ রয়েছে। পর্যটকরা এসব পণ্য কিনছেন।
দোকান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পর্যটন মৌসুম, ছুটির দিন ও বিশেষ দিবসে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়লে এসব পণ্যের বিক্রিও বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেক ব্যবসায়ী পর্যটনকেন্দ্রিক বিক্রির ওপর আয়ের একটি অংশ নির্ভর করছেন। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কের ব্যবসায়ী প্রিয়া রানী ত্রিপুরা বলেন, পর্যটকদের কাছে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পাশাপাশি বাঁশের তৈরি কাপ, বিভিন্ন ধরনের শোপিস, বোতল ও টিস্যুবক্সের চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের টেক্সটাইলের কিছু কাপড় রাঙামাটি থেকে সংগ্রহ করা হয়। বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্র খাগড়াছড়িতেই তৈরি হয়। তবে অধিকাংশ কাপড় নরসিংদী থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও তাঁতজাত পণ্যে পাহাড়ের সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও নান্দনিকতার ছাপ রয়েছে। এ কারণে পর্যটকদের কাছে এসব পণ্যের আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে হাতে বোনা কাপড়ের উৎপাদন সীমিত হওয়ায় বাজারের চাহিদা পূরণে বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। খাগড়াছড়ির আমজাদ হস্তশিল্প স্টোরের মালিক মো. বেলাল হোসেন বলেন, বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী খাগড়াছড়িতেই উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ল্যাম্প, ফুড বাস্কেট, ট্রে, কাপ, মগ ও হুক্কা উল্লেখযোগ্য। তবে শোপিসের বিভিন্ন সামগ্রী জেলার বাইরে থেকে সংগ্রহ করতে হয়। তিনি বলেন, এসব পণ্য তৈরি করতে গেলে কারিগর সংকটে পড়তে হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, বাঁশ-বেতের পণ্যের চাহিদা থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। দক্ষ কারিগরের অভাব, কাঁচামাল সংগ্রহের সমস্যা এবং পর্যাপ্ত উদ্যোক্তার অনুপস্থিতি এ খাতের সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাগড়াছড়িতে বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরি করেন উদ্যোক্তা অসীম কুমার দে। তার কারখানায় বাঁশের কাপ, মগ, বোতল, ট্রে, জগ, কেতলি, টেবিল ল্যাম্প, ফুলদানি, কলমদানি, চুড়ির আলনা ও মোবাইল স্ট্যান্ডসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি করা হয়।
অসীম কুমার দে জানান, তার কারখানায় তৈরি পণ্য খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি সাজেক ও সিলেটের অনেক এলাকাতেও বিক্রি হয়। তবে এই উদ্যোক্তাও বাঁশ ও কারিগর সংকটের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, পণ্যের চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের অভাবে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। খাগড়াছড়িতে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও কাপড়ের চাহিদা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে কাপড় তৈরির উল্লেখযোগ্য কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ কাপড় নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিছু কাপড় রাঙামাটি থেকেও আনা হয়। এছাড়া বাজারে মেশিনে তৈরি পাওয়ার লুমের কাপড়ের পাশাপাশি ‘চায়না’ ও ‘বার্মিজ’ নামে পরিচিত কিছু কাপড় এবং শোপিসও বিক্রি হচ্ছে। ফলে খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রিক পোশাকের বাজারে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের পাশাপাশি বাইরের উৎসনির্ভর পণ্যের উপস্থিতি বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয়ভাবে কাপড় উৎপাদনের ব্যবস্থা গড়ে উঠলে একদিকে পর্যটকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে তাঁতশিল্প ও সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। পাহাড়ি অঞ্চলের হস্তশিল্প ও তাঁতপণ্যের সঙ্গে স্থানীয় নারীদের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের। অনেকে বাড়িতে বসে কাপড় বোনা, হস্তশিল্প তৈরি ও বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের কাজ করেন। এসব পণ্য পর্যটনকেন্দ্রের দোকানে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হলে তাদের আয় ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। তবে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের উৎপাদন এখনও চাহিদার তুলনায় সীমিত। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, নারী কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া গেলে এ খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
খাগড়াছড়ির পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে শুধু হস্তশিল্প ও পোশাকের ব্যবসাই নয়, খাবারের দোকান, পরিবহন, আবাসন এবং অন্যান্য সেবামূলক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হচ্ছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব খাতে নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটকসেবার মান উন্নত করা গেলে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়বে। একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যের মান উন্নয়ন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাগড়াছড়ির পর্যটনশিল্পের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে বাঁশ-বেতের কারুশিল্প, তাঁতপণ্য ও ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে স্থানীয় কারিগর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত খাগড়াছড়িতে পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেই সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দিতে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, কারিগর সংকট দূর করা এবং উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।