পর্যটনেই ঘুরছে অর্থনীতি

এস এম রুবেল: সৈকতের পাশে রিকশা নিয়ে সকাল থেকে অপেক্ষা করছেন আবদুল করিম। কখন পর্যটক আসবেন, কখন মিলবে যাত্রী সেই অপেক্ষায় কেটে যায় তার দিনের বড় একটি সময়। পর্যটন মৌসুমে অপেক্ষার সময় কমে, যাত্রী বাড়ে, আয়ও বাড়ে। কিন্তু পর্যটক কমে গেলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। তখন একই রিকশা, একই রাস্তা, একই মানুষ কিন্তু যাত্রী  কম। সঙ্গে কমে যায় সংসারের আয়ও। আবদুল করিমের গল্প কক্সবাজারের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির একটি ছোট ছবি মাত্র।

এই শহরে পর্যটক মানেই শুধু হোটেলের অতিথি নয়। একজন পর্যটক সৈকতে গেলে রিকশায় ওঠেন, খাবার খান, ছাতা ভাড়া নেন, ছবি তোলেন, বিচ বাইক বা জেটস্কিতে চড়েন, ঝিনুক বা হস্তশিল্প কেনেন। কেউ মেরিন ড্রাইভে যান, কেউ হিমছড়ি-ইনানি, কেউ মহেশখালী বা রামুতে। প্রতিটি গন্তব্যে, প্রতিটি যাত্রায় এবং প্রতিটি কেনাকাটায় তৈরি হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। হোটেল কর্মচারী থেকে রিকশাচালক, রেস্টুরেন্ট শ্রমিক থেকে ফটোগ্রাফার, ছাতা ব্যবসায়ী থেকে বিচ বাইক চালক, জেটস্কি ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ট্যুর অপারেটর, ক্ষুদ্র দোকানি, ঝিনুক ও হস্তশিল্প বিক্রেতা এমনকি মাছ ও খাবারের রেস্টুরেন্ট মালিকদের একটি বড় অংশের আয় কোনো না কোনোভাবে পর্যটকের ওপর নির্ভরশীল।
কক্সবাজারের রেস্টুরেন্টে কাজ করেন মনির, পারভেজ ও মিজান। তাদের ভাষায়, পর্যটক বাড়লেই কাস্টমার বাড়ে। ব্যস্ততা বাড়ে, বিক্রি বাড়ে। ভালো সেবা দিতে পারলে পর্যটকদের কাছ থেকে টিপসও পাওয়া যায়। ব্যবসা ভালো হলে অনেক সময় মালিকের কাছ থেকেও বেতনের বাইরে বাড়তি টাকা মেলে। সৈকতে ছাতা ব্যবসা করেন মাহবুব। তার হিসাবে, পর্যটন মৌসুমে কোনো ছাতা খালি থাকে না। প্রতি ঘণ্টায় একটি ছাতা ৩০ টাকা করে ভাড়া দেওয়া হয়। পর্যটক বেশি থাকলে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যবসা চলে। কিন্তু অফ-সিজনে একই ব্যবসায় আয় অনেকটাই কমে যায়। পর্যটননির্ভর কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমে বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে জনপ্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে এই আয় স্থির নয়। পর্যটকের উপস্থিতি, ছুটির মৌসুম ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী তা কমবেশি হয়।

কক্সবাজারে বেড়াতে আসা অন্তত ৫০ জন পর্যটকের সঙ্গে কথা বলে তাদের ব্যয়ের একটি ধারণা নেওয়া হয়েছে। পরিবহন, খাবার, হোটেল, পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা, কেনাকাটা এবং বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে তারা অর্থ ব্যয় করেন। আলাপ করা পর্যটকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফাইভ-স্টার হোটেলে থাকা পর্যটকদের বাদ দিলে একজন পর্যটকের গড় ব্যয় প্রায় ১০ হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে। তবে এটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়, মাঠপর্যায়ে পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া একটি ধারণামাত্র।

অন্যদিকে পর্যটন ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বছরে কক্সবাজারে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন। যদি এই হিসাবের সর্বনিম্ন সংখ্যা অর্থাৎ ৭০ লাখ পর্যটকও ধরা হয় এবং প্রত্যেক পর্যটকের গড় ব্যয় ১০ হাজার টাকা ধরা হয় তাহলে বছরে পর্যটকদের ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। আর ৮০ লাখ পর্যটক হলে একই হিসাবে তা দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

তবে এই হিসাবকে কক্সবাজারের প্রকৃত পর্যটন অর্থনীতি বলা যাবে না। কারণ পর্যটকের প্রকৃত সংখ্যা, প্রত্যেকের অবস্থানের সময়, ব্যয়ের ধরন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে কত টাকা থাকে এসব বিষয়ে সমন্বিত সরকারি তথ্য নেই। ফলে এটি মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি আনুমানিক হিসাব।

পর্যটনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা বড় হতে পারে তার একটি উদাহরণ পাওয়া যায় ঈদের ছুটিতে। ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের ছয় দিনেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অন্তত ৭ লাখ মানুষ ভ্রমণ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে শুধু হোটেলের কক্ষ পূর্ণ হয় না, একইসঙ্গে বাড়ে রেস্টুরেন্টের বিক্রি, পরিবহনের ট্রিপ, সৈকতের ছাতা ও বিচ বাইকের ব্যবসা, ফটোগ্রাফারের আয়, ক্ষুদ্র দোকানের বিক্রি এবং পর্যটনকেন্দ্রিক নানা সেবার চাহিদা।

চিত্রটি উল্টো হয় অফ-সিজনে। পর্যটক কমলে হোটেলের কর্মচারীদের কাজ কমে যায়। রিকশাচালক কম যাত্রী পান। রেস্টুরেন্টে টেবিল খালি থাকে। পর্যটনকেন্দ্রিক দোকানিদের পণ্য পড়ে থাকে। পরিবহন শ্রমিকের ট্রিপ কমে যায়। বিচ বাইক, জেটস্কি ও ছাতা ব্যবসায়ীদের আয় কমে যায়। মৌসুমি অনেক কর্মীকে তখন বসে থাকতে হয়। অর্থাৎ পর্যটকের সংখ্যা শুধু হোটেল ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহর ও আশপাশের বহু মানুষের দৈনন্দিন আয়।

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, বেশিরভাগ পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রে গোসল ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, ইনানি সৈকত, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, মাথিন কূপ, নাফ নদী, মহেশখালী ও রামুর বৌদ্ধপল্লীতেও পর্যটকরা ঘুরতে যান। ফলে কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি শুধু শহরের হোটেল-মোটেলকেন্দ্রিক নয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে আছে পরিবহন, খাবার, বিনোদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় পণ্য, নৌযান ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রিক সেবায়। পর্যটকদের ঘিরে কক্সবাজারে গড়ে উঠেছে ৫ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউজ এবং ৭ শতাধিক রেস্টুরেন্টের ব্যবসা।

তবে পর্যটকের সঠিক সংখ্যা এবং পর্যটন খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে তার হালনাগাদ সমন্বিত সরকারি হিসাব নেই। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, কক্সবাজারের দৈনিক পর্যটন ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবদুস শুক্কুর সিআইপি বলেন, পর্যটক আসার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হবে। পর্যটন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, কক্সবাজারকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটনবান্ধব গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসন কাজ করছে। পর্যটন সেবার মানোন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।