অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক

ড. মাহবুবুল হাসান

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ইতিহাসে নিজস্ব মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্বাধীনতার পর দেশের নিজস্ব মুদ্রণালয় না থাকায় বিদেশের ওপর নির্ভর করেই কাগজের নোটের চাহিদা মেটাতে হতো। সেই নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং নিরাপদ মুদ্রা উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের নিজস্ব সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস, যা সাধারণ মানুষের কাছে টাঁকশাল নামে পরিচিত।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে কিছুদিন পাকিস্তানি মুদ্রা প্রচলিত ছিল। সে সময় কিছু নোটে ‘বাংলাদেশ’লেখা সিল ব্যবহার করা হতো। ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশের নিজস্ব মুদ্রা টাকা চালু হয়। প্রথম দিকের নোট ছাপানো হয়েছিল ভারতের মুদ্রণালয়ে। পরবর্তী সময়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভর করে নোট মুদ্রণ ও আমদানি করতে হতো। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি নোটের সরবরাহ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতো।

বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৮১ সালে ‘সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস’নামে একটি প্রকল্প তৈরি করে। ১৯৮৩ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ঢাকার অদূরে গাজীপুরের শিমুলতলীতে প্রায় ৬৬ দশমিক ৫২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে এই প্রতিষ্ঠান।

১৯৮৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ১ টাকা ও ১০ টাকার নোট ছাপানোর মধ্য দিয়ে দেশের নিজস্ব মুদ্রা উৎপাদনের যাত্রা শুরু হয়। এর প্রায় দেড় বছর পর, ১৯৮৯ সালের ৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের উদ্বোধন করা হয়। এটি ছিল দেশের মুদ্রা উৎপাদনে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ১৯৯২ সালের ২২ এপ্রিল ‘দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’ নামে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির পুরো মূলধন জোগান দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তামূলক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।

টাঁকশালের কাজ শুধু টাকা ছাপানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে চাহিদা অনুযায়ী প্রাইজ বন্ড, সঞ্চয়পত্র, স্মারক ডাকটিকিট, ট্রেজারি বন্ড, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, রেভিনিউ স্ট্যাম্প, বিভিন্ন ধরনের কর-লেবেল এবং নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অন্যান্য দলিলও ছাপানো হয়। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপত্র এবং নম্বরপত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র মুদ্রণেও প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখে।

টাকার নোট ছাপানো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজ। নোটের নকশা, কাগজ, রঙ, জলছাপ, নিরাপত্তা সুতা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য জালনোট প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিটি নোটের মান নিশ্চিত করতে উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা ও যাচাই প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদিত নোট সরবরাহের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে টাঁকশাল দেশের নগদ অর্থ সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়ন ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব টাঁকশাল প্রতিষ্ঠার ফলে বিদেশ থেকে নোট ছাপিয়ে আনার ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে নিরাপত্তামূলক মুদ্রণপ্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার পথও উন্মুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের টাঁকশাল টাকা তৈরির কারখানার পাশাপাশি আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রতীক।

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি