ড. মো. আতাউর রহমান
বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে কোনো দেশকে জানতে হলে শুধু তার বর্তমানকে দেখলে চলে না; কখনো কখনো মাটির কয়েক ফুট নিচেও তাকাতে হয়। কারণ ভূগর্ভে চাপা পড়ে থাকা একটি ইট, একটি মুদ্রা, একটি পোড়ামাটির ফলক কিংবা বিলুপ্ত নগরের কোনো দেয়াল এমন ইতিহাসের সাক্ষ্য দিতে পারে, যা শত শত বছর ধরে মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কথাটি বিশেষভাবে সত্য। আমরা বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলি, সবুজের দেশ বলি, সমুদ্র-পাহাড়-সুন্দরবনের দেশ হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরি। কিন্তু এই পরিচয়ের পাশাপাশি আরও একটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রয়েছে—প্রাচীন জনপদ, নগর, বন্দর, বিহার, মন্দির, মসজিদ, দুর্গ, প্রাসাদ ও বিস্মৃত বসতির বাংলাদেশ।
এই বাংলাদেশকে এখনো আমরা পর্যটনের মানচিত্রে তার প্রাপ্য গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে পারিনি। আর এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা। পর্যটন যখন অতীতের দরজা খুলে দেয়। প্রত্ন-পর্যটন বা Archaeological Tourism নিছক পুরোনো স্থাপনা দর্শন নয়। এটি এমন এক পর্যটন, যেখানে একজন মানুষ একটি স্থানের দৃশ্যমান সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার গল্পের সন্ধান করেন।
মহাস্থানগড়ের প্রাচীন দুর্গপ্রাচীরের পাশে দাঁড়ানো কিংবা পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা তাই কোনো সাধারণ ভ্রমণের সমতুল্য নয়। সেখানে বর্তমানের পর্যটক যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রবেশ করেন শত কিংবা সহস্র বছর আগের মানুষের জগতে।
কারা এখানে বাস করত? কীভাবে গড়ে উঠেছিল নগর? কোথা দিয়ে চলত বাণিজ্য? কীভাবে বিকশিত হয়েছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, শিল্প ও স্থাপত্য? কোন পরিবর্তনে একটি জনপদ সমৃদ্ধ হয়েছে, আবার কোন ঘটনায় সেটি হারিয়ে গেছে? প্রত্নতত্ত্ব এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজে; আর প্রত্ন-পর্যটন সেই উত্তরগুলো সাধারণ মানুষের সামনে জীবন্ত করে তোলে।
এই ভূখণ্ড শুধু একটি রাষ্ট্রের বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীন হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মানুষের জীবন, বসতি ও সংস্কৃতির ইতিহাস তার চেয়ে বহু বহু পুরোনো তথা হাজার বছরের। এই একটি উপলব্ধিই আমাদের পর্যটন-ভাবনাকে বদলে দিতে পারে।
বর্তমান রাষ্ট্রসীমাকে ইতিহাসের সূচনা বিন্দু না ধরে যদি এই বদ্বীপের দীর্ঘ মানবিক ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রাকে সামনে আনা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন পরিচয়ও নতুন মাত্রা পাবে। নদী ও ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের বসতি স্থানান্তরিত হয়েছে; গড়ে উঠেছে জনপদ, কৃষি, বাণিজ্যপথ ও নগরকেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে জৈন বৌদ্ধ, হিন্দু, ইসলামি সংস্কৃতি এ ভূখণ্ডকে সমৃদ্ধ করেছে। এসেছে নানা জনগোষ্ঠী, শাসনব্যবস্থা ও স্থাপত্যরীতি।
ফলে বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য কোনো একক রাজবংশ, ধর্ম কিংবা সময়ের ইতিহাস নয়। এটি বহু সময় ও বহু সাংস্কৃতিক
প্রবাহের সম্মিলিত উত্তরাধিকার। মহাস্থান থেকে পাহাড়পুর—ইটের ভেতর লেখা ইতিহাস। বগুড়ার মহাস্থানগড় বাংলাদেশের প্রাচীন নগর ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের সঙ্গে চিহ্নিত এই প্রত্নস্থল এবং এর আশপাশের বিস্তৃত প্রত্নাঞ্চল প্রমাণ করে যে উত্তরবঙ্গ বহু আগেই নগরায়ণ, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু একজন পর্যটক মহাস্থানগড়ে গিয়ে শুধু একটি প্রাচীন প্রাচীর দেখবেন—এটাই কি যথেষ্ট?
তার সামনে যদি সেই সময়ের নগরটির সম্ভাব্য রূপ ডিজিটালভাবে পুনর্নির্মাণ করে দেখানো হয়, প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাখ্যা করা হয়, বাণিজ্য ও যোগাযোগের পথ তুলে ধরা হয়—তাহলেই কয়েকটি ইটের দেয়াল তার কাছে একটি জীবন্ত নগরের গল্প হয়ে উঠতে পারে।
একইভাবে নওগাঁর পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার বাংলাদেশের এমন এক সম্পদ, যার গুরুত্ব বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করেছে। একসময় এটি ছিল শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর স্থাপত্যরীতি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ স্থাপত্যেও প্রভাব ফেলেছে।
আজ পাহাড়পুর UNESCO-স্বীকৃত বিশ্বঐতিহ্য (World Heritage-1985)। অথচ এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে আমরা কতটা আন্তর্জাতিক পর্যটনে রূপ দিতে পেরেছি—সে প্রশ্নটি তোলা প্রয়োজন। ময়নামতি, উয়ারী-বটেশ্বর এবং হারানো জনপদের সন্ধান। কুমিল্লার ময়নামতি-লালমাই অঞ্চল যেন বাংলাদেশের মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আরেকটি ইতিহাসের গ্রন্থাগার। শালবন বিহারসহ এখানে আবিষ্কৃত বিভিন্ন বিহার, স্তূপ, মুদ্রা, তাম্রলিপি, পোড়ামাটির ফলক ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
আবার নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর বাংলাদেশের প্রাচীন বাণিজ্য ও জনবসতির ইতিহাস নিয়ে নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এখানে পাওয়া প্রত্ননিদর্শন, দুর্গবেষ্টিত বসতির চিহ্ন, মুদ্রা, পুঁতি ও অন্যান্য সামগ্রী ইঙ্গিত করে যে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো প্রান্তিক অঞ্চল ছিল না; বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সঙ্গেও এর যোগসূত্র ছিল। প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই—প্রতিটি আবিষ্কার আমাদের পরিচিত ইতিহাসে নতুন প্রশ্ন যোগ করতে পারে। আর পর্যটনের জন্য একটি ভালো প্রশ্ন কখনো কখনো একটি সুন্দর দৃশ্যের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
বাগেরহাট থেকে সোনারগাঁও—সভ্যতার ধারাবাহিক পাঠ
বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনের শক্তি শুধু প্রাচীন যুগেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ-পশ্চিমে খান জাহানের ঐতিহাসিক খলিফাতাবাদ বা বাগেরহাট, ষাটগম্বুজ মসজিদসহ অসংখ্য স্থাপত্যের মাধ্যমে মধ্যযুগের নগর পরিকল্পনা, ধর্মীয় স্থাপত্য ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করছে।
এই ঐতিহাসিক মসজিদনগরীও UNESCO বিশ্বঐতিহ্যের (World Heritage-1985) অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সোনারগাঁ, পানাম নগর, ঢাকার লালবাগ দুর্গ, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, গৌড় গ্রুপ অব মনুমেন্টস্ বিভিন্ন নিদর্শন এবং দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জমিদারবাড়ি, মন্দির, মসজিদ, দুর্গ ও ঔপনিবেশিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ যেন এক বিস্তৃত উন্মুক্ত ইতিহাস ঐতিহ্য জাদুঘর। সমস্যা হচ্ছে, এই জাদুঘরের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু সেগুলোকে যুক্ত করে দর্শনার্থীকে গল্পটি বলার ব্যবস্থা এখনো দুর্বল।
বিচ্ছিন্ন দর্শনীয় স্থান নয়, প্রয়োজন ‘হেরিটেজ টুরিজম সার্কিট’
বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনকে এগিয়ে নিতে হলে প্রথমেই ‘একটি জায়গা দেখতে যাওয়া’ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীর সফল ঐতিহ্য পর্যটনের বড় একটি বৈশিষ্ট্য হলো—একাধিক ঐতিহাসিক স্থানকে একটি গল্প, সময়কাল কিংবা অঞ্চলের ভিত্তিতে সংযুক্ত করা। বাংলাদেশেও গড়ে তোলা যেতে পারে Heritage Tourism Circuit বা প্রত্ন-পর্যটন সার্কিট। মহাস্থানগড়-পাহাড়পুর-কান্তজিউ মন্দিরকে যুক্ত করে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যপথ; ঢাকা-সোনারগাঁ-উয়ারী-বটেশ্বরকে যুক্ত করে মধ্যাঞ্চলের ইতিহাসপথ; ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যভিত্তিক সার্কিট; আর বাগেরহাট ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘিরে মধ্যযুগীয় মুসলিম ঐতিহ্য ভিত্তিক বাংলার স্থাপত্যপথ তৈরি করা সম্ভব। এতে পর্যটক একটি স্থানে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরে না গিয়ে পুরো অঞ্চলে দুই-তিন দিন অবস্থান করবেন। উপকৃত হবে স্থানীয় আবাসন, পরিবহন, খাবারের দোকান, হস্তশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। অর্থাৎ প্রত্নঐতিহ্য তখন কেবল সংরক্ষণের বিষয় থাকবে না; সংরক্ষণ বজায় রেখেই সেটি স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠবে।
পর্যটনের সবচেয়ে বড় ঘাটতি—‘গল্প বলা’
আমাদের অনেক প্রত্নস্থলের একটি সাধারণ সমস্যা রয়েছে। পর্যটক সেখানে পৌঁছে দেখেন ইটের ভিত্তি, ভাঙা দেয়াল কিংবা কোনো ঢিবি। ছোট একটি সাইনবোর্ডে দু-চারটি তথ্য পড়ে ছবি তুলে তিনি ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি হয়তো কখনোই জানতে পারেন না—তার সামনে যে ছোট দেয়ালটি রয়েছে সেটি একসময় বিশাল কোনো স্থাপনার অংশ ছিল; যে নির্জন মাঠে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে হয়তো একসময় শত শত মানুষের পদচারণা ছিল।
আধুনিক Heritage tourism-এর প্রাণ হলো interpretation—অর্থাৎ ইতিহাস ঐতিহ্যকে বোধগম্য ও আকর্ষণীয়ভাবে ব্যাখ্যা করা।
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলে তাই প্রয়োজন আধুনিক visitor centre, প্রশিক্ষিত heritage guide, গবেষণাভিত্তিক মানচিত্র, সময়রেখা, reconstruction image, documentary, শিশু-কিশোরদের উপযোগী learning space এবং বাংলা-ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় তথ্য সম্বলিত নানান সাইটের ফোল্ডার উপস্থাপন।
কারণ প্রত্নস্থল নিজে কথা বলে না; তাকে কথা বলাতে হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমাদের হারানো নগরকে আবার দেখাতে পারে?
২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য—“Digital Agenda and Artificial Intelligence to Redesign Tourism”—বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, Augmented Reality, Virtual Reality, 3D modelling এবং digital reconstruction ব্যবহার করে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রত্নস্থলের সম্ভাব্য অতীত রূপ দর্শনার্থীর সামনে তুলে ধরা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়।
ভাবুন, একজন পর্যটক মহাস্থানগড়ে মোবাইল ক্যামেরা কোনো ধ্বংসাবশেষের দিকে ধরলেন। পর্দায় ধীরে ধীরে সেই ধ্বংসাবশেষের ওপর উঠে এলো শত শত বছর আগের সম্ভাব্য স্থাপনার ত্রিমাত্রিক রূপ। কিংবা পাহাড়পুরে দাঁড়িয়ে একটি AR guide পর্যটককে বুঝিয়ে দিচ্ছে—কোন অংশে কী ছিল, কোথায় ভিক্ষুরা বাস করতেন, কীভাবে পুরো স্থাপনাটি সংগঠিত ছিল।
QR code স্ক্যান করে পাওয়া যেতে পারে বাংলা, ইংরেজি, জাপানি কিংবা অন্য ভাষায় audio guide। AI-ভিত্তিক digital guide পর্যটকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের শিক্ষার্থীও বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য ঘুরে দেখতে পারে।
এ প্রযুক্তি শুধু পর্যটনের সুবিধা নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী দৃশ্যমান করার সুযোগ।
তবে প্রযুক্তিকে অবশ্যই গবেষণার সহযোগী হতে হবে, ইতিহাসের বিকল্প নয়। যেখানে তথ্য নিশ্চিত নয়, সেখানে ডিজিটাল পুনর্নির্মাণকেও অনুমান হিসেবেই স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
ঐতিহ্য রক্ষা না করলে পর্যটনের সম্পদও থাকবে না;
প্রত্ন-পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি সম্ভবত ‘পর্যটন’ নয়—‘সংরক্ষণ’।
কারণ একটি প্রত্নস্থল একবার নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পুনর্নির্মাণ করা গেলেও তার ঐতিহাসিক সত্যতা ফিরিয়ে আনা যায় না। অপরিকল্পিত নির্মাণ, দখল, দূষণ, দেয়ালে লেখা, প্রত্নবস্তু চুরি বা পাচার, অনিয়ন্ত্রিত দর্শনার্থীর চাপ এবং ভুল সংস্কার—সবই প্রত্নঐতিহ্যের জন্য বিপজ্জনক। অতএব বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনের মূলনীতি হওয়া উচিত—
সংরক্ষণ আগে, পর্যটন তার সহযোগী। স্থানীয় মানুষকে এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশ করাও জরুরি। একটি গ্রামের পাশের প্রত্নস্থল যদি সেই গ্রামের মানুষের আয়, পরিচয় ও গর্বের উৎস হয়, তাহলে তারাই হয়ে উঠতে পারেন সেই ঐতিহ্যের সবচেয়ে কার্যকর রক্ষক।
স্থানীয় শিক্ষিত তরুণদের Heritage guide হিসেবে প্রশিক্ষণ, নারীদের ঐতিহ্যভিত্তিক হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা, স্থানীয় খাবার ও লোকসংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা—এসবের মাধ্যমে প্রত্ন-পর্যটনের সুফল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
আমাদের মাটির নিচে এখনো কত ইতিহাস?
বাংলাদেশের আরেকটি সম্ভাবনা হলো—আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
নদীপ্রধান বদ্বীপের ভূপ্রকৃতি, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, পলি সঞ্চয় এবং ঘন মানববসতির কারণে বহু প্রাচীন নিদর্শন হয়তো এখনো দৃশ্যমান নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, বৈজ্ঞানিক খনন ও আন্তঃবিষয়ক গবেষণা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের মানববসতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস আরও পরিষ্কার হতে পারে।
সেই গবেষণার ফল আবার নতুন পর্যটন গন্তব্যের জন্ম দিতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করার নামে অতিরঞ্জিত দাবি কিংবা প্রমাণহীন প্রাচীনত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রত্ন-পর্যটনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করবে। কারণ বিশ্বমানের heritage tourism-এর ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা।
আমাদের ইতিহাস যতটুকু প্রমাণিত, সেটিই এত সমৃদ্ধ যে তাকে বড় করে দেখানোর জন্য কল্পনার প্রয়োজন নেই।
পৃথিবীর কাছে বাংলাদেশের আরেকটি গল্প বলার সময় এসেছে বিশ্ব পর্যটনের বাজারে প্রতিটি সফল গন্তব্য শেষ পর্যন্ত একটি গল্প বিক্রি করে। কেউ বলে প্রাচীন সভ্যতার গল্প, কেউ সাম্রাজ্যের, কেউ শিল্পের, কেউ প্রকৃতির।
বাংলাদেশের গল্প কী? সেটি শুধু দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কিংবা বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের গল্প নয়। এর সঙ্গে রয়েছে নদীবাহিত এক বদ্বীপে হাজার বছরের মানব জাতির অভিযোজনের গল্প; নগর গড়ে ওঠা ও হারিয়ে যাওয়ার গল্প; ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থানের গল্প; বাণিজ্যপথ, জ্ঞানচর্চা, শিল্প ও স্থাপত্যের গল্প।
মহাস্থানগড়ের দুর্গ প্রাচীর, পাহাড়পুরের তথা সোমপুর বিহারের পোড়ামাটি, ময়নামতির বিহার, উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নবস্তু কিংবা বাগেরহাটের ইটের গম্বুজ—আলাদা আলাদা করে দেখলে এগুলো কয়েকটি প্রত্নস্থান।
একটি সুসংগঠিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে এগুলো একই দীর্ঘ ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়। বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬ এসে তাই আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—বাংলাদেশকে পৃথিবীর সামনে আমরা কীভাবে উপস্থাপন করতে চাই। প্রকৃতির বাংলাদেশ অবশ্যই থাকবে। তার সঙ্গে দৃশ্যমান হতে হবে সভ্যতার বাংলাদেশও। প্রয়োজন আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের visitor experience, দক্ষ heritage guide, ডিজিটাল উপস্থাপনা এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে নিজেদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
একদিন হয়তো পৃথিবীর কোনো প্রান্তের একজন পর্যটক বাংলাদেশে আসবেন শুধু সুন্দরবন কিংবা কক্সবাজার দেখতে নয়; তিনি আসবেন পুণ্ড্রের প্রাচীন নগরের পথে হাঁটতে, সোমপুরের জ্ঞানকেন্দ্রকে বুঝতে, ময়নামতির হারানো অধ্যায়ের সন্ধান করতে কিংবা মধ্যযুগীয় খলিফাতাবাদের নগরজীবনের অথবা গৌড়ে সুলতানদের গড়ে তোলা ঐশ্বর্য্য মন্ডিত রাজধানী নান্দানিক স্থাপত্যের গল্প জানতে। সেই সম্ভাবনা বাংলাদেশের মাটিতে ইতোমধ্যেই রয়েছে। আমাদের কাজ নতুন ইতিহাস তৈরি করা নয়—যে ইতিহাস এই মাটি হাজার বছর ধরে ধারণ করে আছে, তাকে খুঁজে বের করা, রক্ষা করা এবং পৃথিবীর কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা। কারণ প্রত্নঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতিচিহ্ন নয়। এটি একটি দেশের পরিচয়ের দলিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উত্তরাধিকার এবং সঠিক পরিকল্পনায়—অর্থনীতি ও পর্যটনের এক অনন্য সম্পদ। হাজার বছরের ঐতিহ্যের এই বাংলাদেশ তাই শুধু দেখার দেশ নয়—পড়ার, জানার এবং আবিষ্কার করারও দেশ।
উপপরিচালক
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়
(তথ্যসূত্র : প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকাশনা ও এআই প্রযুক্তির সহযোগিতায়)।