কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: আজ মধ্যরাত থেকে শুরু হচ্ছে সাগর ও নদীতে মাছ শিকারে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এ অবস্থায় ইলিশ মৌসুম শেষের দিকে হলেও পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দুই মৎস্যবন্দরসহ ৫ শতাধিক মাছের আড়তে মাছের আমদানি নেই। এতে বিপাকে পড়েছে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
যে সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ছে, তা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। অন্য মাছের দামও আকাশচুম্বি।
গবেষকরা বলেন, ৫৮ দিন, ২২ দিনসহ বিভিন্ন অবরোধে আসলেই কি মাছের উৎপাদন বাড়ছে? নাকি সামুদ্রিক এ সম্পদ গতিপথ পরিবর্তন করেছে? এ বিষয়টি নতুন করে আবারও গবেষণা প্রয়োজন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় গত অর্থবছরে প্রায় ৩৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশের আহরণ হয়েছিল। সামুদ্রিক অন্যান্য মাছ আহরণ হয়েছিল ৮০ থেকে ৯০ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু এ বছর মাছের আমদানি নেমেছে অর্ধেকে।
গত এক সপ্তাহ ধরে সমুদ্রে ও উপকূলে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকলেও আলিপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরে ইলিশের আমদানি নেই বললেই চলে। সামুদ্রিক অন্যান্য যে মাছ ধরা পড়ছে তার বেশিরভাগই লইট্টা, লাল ফাইসা, পোয়া, গাগড়া ও ছোট ছোট টুনা।
আলীপুরের জেলে আরমান, শওকত হোসেন জানান, তাদের অবস্থা এমন হয়েছে এ মৌসুমে বাড়িতে কোন টাকা নিতে পারেননি। দিন-রাত সমুদ্রে থাকেন। কিন্তু ফিরে আসলেই দেনাদারদের চাপ।
জেলেরা বলেন, এমনিতেই সাগরে মাছ নেই, এ অবস্থায় আজ ট্রলার ডগে তুলেছেন। জানি না আগামী ২২ দিন কিভাবে চলবে।
ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলেন, কলাপাড়ার আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরের প্রত্যেক আড়ত মালিক গড়ে ২০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা এখনো লোকসানে আছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের মাছের ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।
ট্রলার মালিক আনসার মিয়া বলেন, এ মৌসুমে ৭ লাখ টাকার তেল বাকিতে কিনেছেন। মুদি দোকানে পাবে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। বরফ কল মালিক পাবে দেড় লাখ। কবে দিতে পারবেন, তা বলতে পারছেন না।
একাধিক ট্রলার মালিকরা বলেন, তেলের দোকানে, মুদি দোকানে এতো পরিমাণ বাকি পড়েছে যে- টলার বিক্রি করে দিতে হবে।
এদিকে কলাপাড়াসহ উপকূলের সামুদ্রিক জলসীমায় টুলিং বোট বন্ধে বছরজুড়ে আন্দোলন সংগ্রাম করলেও অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে পেশা হারাতে বসেছে জেলেরা। তারা সরকারের কাছে অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধ এবং ট্রলিং বোট বন্ধের দাবি জানান।
জেলেরা বলেন, তারা ২২ দিন অবরোধ মানবেন। কিন্তু ট্রলিং মালিকরা এসব মানে না। এ কারণে অবরোধ শেষে সাগরে গিয়ে আদৌ মাছ পাবেন কিনা সংশয় রয়েছে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মে. জহিরুন্নবী বলেন, আশা করি ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সঠিক বাস্তবায়ন হলে নভেম্বরের শুরু থেকে প্রচুর মাছ ধরা পড়বে। অবরোধ চলাকালীন কলাপাড়ার ১৮ হাজার ৩০৬ জেলেজে সরকারি প্রণোদনার চাল দেয়া হবে। যাতে তাদের কোন সমস্যা না হয়।
এ বিষয়ে শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালের ফিসারিজ এন্ড মেরিন সাইন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বর্তমানে মাছের উৎপাদন যে হারে কমছে তার কারণ জানতে নতুন করে গবেষণা প্রয়োজন। সামুদ্রিক জলসীমায় ইলিশের উৎপাদন এভাবে কমে যাওয়া একটি অশনি সংকেত বলে মনে করেন এই গবেষক।
তিনি বলেন, অবরোধের সময় সীমা আবার নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে। এখন অধিকাংশ মাছের পেটে ডিম। আর জালে যা ধরা পড়ছে বেশিরভাগই ছোট ইলিশ।
কলাপাড়ার ৫০ হাজারেরও বেশি জেলে সমুদ্র ও নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু মাছ সংকটের কারণে এখন এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে জেলেরা। ইতোমধ্যে রাবনাবাদ নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো এমন ২ শতাধিক জেলে মাছ ধরা ছেড়ে এখন শ্রমিক হিসেবে বিভিন্ন এলাকা ও ইটভাটায় যোগ দিয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এনজে