জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একই বাজারে বাজার করেন সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা। দুজনকেই বাড়িভাড়া দিতে হয়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়, কিনতে হয় চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। কিন্তু বেতন বাড়ার নিয়ম কি দুজনের জন্য এক? একজনের বেতন বাড়ে নির্ধারিত স্কেল অনুযায়ী, অন্যজনকে কি অপেক্ষা করতে হয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের জন্য?
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। আর মূল্যস্ফীতির সময়ে এই পার্থক্য সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে তাদের পারিবারিক বাজেটে।
সরকারি চাকরিজীবীদের কথায়
সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো পদ, গ্রেড এবং প্রযোজ্য বেতন আদেশ। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতাসহ প্রযোজ্য অন্যান্য ভাতা যোগ হয়। চাকরির নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে পদোন্নতি, নতুন বেতন স্কেল এবং অন্যান্য সুবিধার ক্ষেত্রে আলাদা বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট সরকার নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করে। এতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর বেতন আদেশ জারি হয় এবং ১৯ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়।
তবে নতুন বেতন স্কেল ঘোষণা হলেই প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী একই অঙ্কের টাকা বাড়তি পান না। কার কতটা মূল বেতন বাড়বে, তা নির্ভর করে তার বর্তমান গ্রেড, মূল বেতন এবং নতুন আদেশে নির্ধারিত বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের কথায়
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সবার জন্য একই বেতন কাঠামো নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো অনুসরণ করে, কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীর দক্ষতা, দায়িত্ব, কাজের ফলাফল এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় বেতন বাড়ায়। কোথাও বার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট হয়, আবার কোথাও বেতন পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে।
অর্থাৎ, বেসরকারি চাকরিতে বেতন বাড়ার হার এবং সময় সব প্রতিষ্ঠানে এক নয়। তবে এর মানে এই নয় যে সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি বন্ধ রয়েছে, কিংবা সব সরকারি কর্মচারীর বেতন প্রতিবছর একই হারে বাড়ে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি খাতের সব কর্মীর বেতনও শুধু মালিকপক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। সংশ্লিষ্ট শ্রম আইন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং চাকরির শর্ত অনুযায়ী যেসব বিধান প্রযোজ্য, সেগুলোও মানতে হয়। বিশেষ করে নির্দিষ্ট শিল্প খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির বিধান গুরুত্বপূর্ণ।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির সম্পর্ক কোথায়
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। অর্থাৎ, জাতীয় পর্যায়ের গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কিছুটা কম ছিল।
তবে এই পরিসংখ্যানকে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সরাসরি তুলনা হিসেবে দেখা যাবে না। জাতীয় মজুরি সূচক মূলত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের নির্বাচিত শ্রমজীবীদের মজুরির পরিবর্তন তুলে ধরে। এটি সব বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির হার নয়।
তারপরও এই তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। আয় বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বেতন কাঠামো থাকায় বেতন বৃদ্ধির নিয়ম তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। অন্যদিকে, বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বেতননীতি, চাকরির চুক্তি, কর্মদক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে শুধু বেতন বৃদ্ধির হার দেখলেই কার আর্থিক অবস্থা ভালো, তা বোঝা যায় না। বেতনের পরিমাণ, চাকরির নিরাপত্তা, অবসর সুবিধা, বোনাস, চিকিৎসা সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও বিবেচনা করতে হবে।
সব মিলিয়ে, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার নিয়ম এক নয়। কিন্তু দুপক্ষের জন্যই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আয় বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখা।
কারণ, বেতন কত বাড়ল, শুধু সেটিই শেষ কথা নয়। বেতন বাড়ার পর একজন মানুষ আগের তুলনায় কতটা বেশি প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন, সেটিই তার প্রকৃত আর্থিক স্বস্তির বড় মাপকাঠি।
সরকারি চাকরিতে বেতন বাড়ে, বেসরকারিতে কী নিয়ম?
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী-দুজনই একই বাজারে কেনাকাটা করেন। কিন্তু তাদের বেতন বাড়ার নিয়ম এক নয়। সরকারি চাকরিতে পদ, গ্রেড ও নির্ধারিত বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন বাড়ে। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি নির্ভর করতে পারে প্রতিষ্ঠানের নীতি, কর্মদক্ষতা, দায়িত্ব এবং আর্থিক অবস্থার ওপর। তবে সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ইনক্রিমেন্ট বন্ধ, এমন তথ্য নেই। আবার সরকারি চাকরিতেও সবার বেতন একই হারে বাড়ে না। প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়ার পর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন কতজন?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি