অন্তর্বর্তী সরকারের ঋণ ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা
  • ২০২৪ সালের জুলাই শেষে অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ৮ লাখ ৯ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা
  • ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায়
  •  চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সরকার নতুন করে নিয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা 
  • ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হয়েছে ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা
  • রাজস্ব আদায় কম ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ বাড়ায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে
  • দীর্ঘদিন পর জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ফিরেছে ইতিবাচক প্রবাহ

আহমেদ ফেরদাউস খান, ঢাকা: রাজস্ব আদায় ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি যখন নিম্নমুখী ঠিক সেই সময়ে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেড় বছরে ২ লাখ ৮৫ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে সরকার। আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় অভ্যন্তরীণ খাত থেকে মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সম্প্রতি সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়া সরকারের জন্য স্বস্তির বার্তা। ফলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ কমে এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিকল্প উৎস শক্তিশালী হয়। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই শেষে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ ছিল ৮ লাখ ৯ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা যা চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। অর্থাৎ দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ঋণ নিয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সরকার ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত উৎস মিলে মোট ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা নিট ঋণ নিয়েছে যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ বেড়েছে প্রায় ৮১ শতাংশ।

এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা যা বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ৬২ দশমিক ৪০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে সরকার ঋণ নেয় ১৫ হাজার ৫৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকা যা বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর ব্যাংক ছাড়া  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি  বন্ড ইস্যু করার মাধ্যমে ৭ হাজার ১১৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাড়েনি। রাজস্ব ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। সরকারি ব্যয়—বিশেষ করে বেতন, ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয়—চলমান থাকায় বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রয়োজন হয়েছে। এছাড়া আগের নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতেও নতুন ঋণ নিতে হয়। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মোট ঋণ বাড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২২ হাজার ১৯৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে এবং ১০ হাজার ৬৫৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করে। ফলে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট ৮ হাজার ৭৯১ কোটি ৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৮৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

সূত্র মতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক ছাড়া অন্য উৎস থেকে সরকারের মোট পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা যার মধ্যে ঋণের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৯৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ১১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকার ১১ হাজার ৪৬ কোটি ২ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করে এবং ১১ হাজার ১২২ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করে। ফলে একই উৎস থেকে (নিট) ৭৫ দশমিক ৯ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়।

ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড ও সুকুকে বাড়ছে অংশগ্রহণ

প্রচলিত মুদ্রাবাজারে অংশগ্রহণ করে না—এমন শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর তারল্য চাহিদা মেটাতে ২০০৪ সালে চালু করা হয় বাংলাদেশ সরকারি ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড (বিজিআইআইবি)। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–জানুয়ারি সময়ে এই তহবিলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। একই সময়ে এ তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। ফলে সাত মাসে বিজিআইআইবি তহবিলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর নিট ব্যালেন্স বেড়েছে ৬ হাজার ৮৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। 

অন্যদিকে শরিয়াহভিত্তিক উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন দিগন্ত তৈরি করেছে বাংলাদেশ সরকারি বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া এ বন্ডের আওতায় এখন পর্যন্ত সরকার ইজারা ও ইস্তিসনা পদ্ধতিতে ছয়টি সুকুক বন্ড ইস্যু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি শেষে বিজিআইএসের বকেয়া স্থিতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সরকারি অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এবং পেনশনভোগী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব স্কিমে নতুন বিনিয়োগ বাড়ায় সামগ্রিকভাবে সঞ্চয়পত্র খাতে ইতিবাচক নগদ প্রবাহ তৈরি হয়েছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৫৪ হাজার ৯০৬ কোটি ৮০ লাখ। একই ৫৪ হাজার ২৯৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে নিট বিক্রি ৬০৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ৩৬ হাজার ৪৬৩ কোটি ১০ লাখ। পরিশোধ হয়েছিল ৪৩ হাজার ৪৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। সরকারের ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭ হাজার ১৩ কোটি ২ লাখ টাকা।  

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকে সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় কম রাজস্ব আদায়, উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ এবং বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে যা বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল না। ফলে সরকারের ঋণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও ছিল না।

তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রে এই পুনরুদ্ধার সরকারের জন্য আশাব্যঞ্জক, কারণ এতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে সুদ ব্যয় বাড়িয়ে আর্থিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। নন-ব্যাংকিং উৎস থেকে ঋণের লক্ষ্য ছিল ২১ হাজার কোটি টাকা এবং যার মধ্যে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্পের নিট বিক্রয় থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।