একীভূত হচ্ছে না আরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো
  • বিদ্যুৎ বিভাগ সমন্বয়-৩ শাখার চূড়ান্ত প্রতিবেদন—
  • সুপারিশে একীভূতকরণের কথা থাকলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা মানা হয়নি
  • পবিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ
  •  পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইন ২০১৩ এর পরিপ্রেক্ষিতে পবিসের সব জটিলতা দূর করা সম্ভব
  • আরইবি ও পবিসের দীর্ঘদিনের বিরোধ মেটাতে রাষ্ট্রপক্ষও সফল হয়নি

‘সাধারণ গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে বৈষম্যের কারণে’

—ড. এম শামসুল আলম   

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে এক ও অভিন্ন চাকরি বিধিসহ সাত দফা দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মীরা। পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে প্রতিবেদনে সমিতি একীভূতকরণের বিভিন্ন দিক উঠে এলেও সেই প্রতিবেদনের তোয়াক্কা করা হয়নি। অবশেষে আগের মতোই থাকছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ও সমিতিগুলো। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ সমন্বয়-৩ শাখার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ে বিআরইবি ও পবিসকে একীভূতকরণের বিষয়ে সুপারিশ করা হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এক ধরনের ম্যানিপুলেটেড করা হয়েছে, যার ফলে পবিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।    

জানা গেছে, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মতো অভিন্ন চাকরিবিধি প্রণয়নসহ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও সমিতিগুলোর একীভূতকরণ অথবা বিদ্যুৎ বিতরণী সংস্থার মতো কোম্পানি গঠনের বিষয়ে উত্থাপিত দাবি পর্যালোচনার লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৭ জুন কমিটি গঠন করা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্তি সচিব মো. সবুর হোসেনকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির কার্যপরিধি হিসেবে আহ্বায়কের নেতৃত্বে গত ২৯ ও ৩০ জুন বিশেষজ্ঞ সদস্য এবং সদস্য সচিব উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলা নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর এবং রংপুর জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি পরিদর্শন করেন। মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয় সাভারেও মতবিনিয়ময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

পরিদর্শন ও সভা শেষে উঠে আসে ত্রুটি বিচ্যুতিসহ বিভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি ও বৈষম্যের চিত্র। পবিস চাকরিবিধি, ১৯৯২ (সংশোধিত ২০১২) অনুযায়ী নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি-বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে থাকে। সমিতির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, পল্লী বিদ্যুৎ আইন, ২০১৩ এর আইনের আওতায় বিধিটি প্রণয়নের বাধ্য-বাধকতা থাকলেও এটি বিআরইবির ৪৯২তম বোর্ড সভার ১২৪৯৫ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রণীত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন গ্রহণ এবং গেজেট প্রকাশ করা হয়নি। ১ থেকে ৪নং গ্রেডের সব লোকবল নিয়োগ সমিতি প্রদান করলেও আরইবির প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন এবং সব নিয়োগের প্রশ্নপত্র ওই প্রতিনিধি ঢাকা থেকে প্রণয়ন করেন। নিয়োগ কার্যক্রম বিআরইবি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয়।

পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সমিতিতে যোগদানকারী একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ জেনারেল ম্যানেজার অথবা সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার পদে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ পদের নির্দিষ্ট কোনো পদমর্যাদা নেই। এ পদটি নির্বাহী প্রকৌশলী অথবা উপ-পরিচালক পদের সমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা ষষ্ঠ গ্রেডের সমপর্যায়। ফলে জেলা/উপজেলা পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সভায় তারা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন না। পদোন্নতির ক্ষেত্রে পবিসের সহকারী এনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর ও সহকারী জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারদের পদোন্নতির মাধ্যমে পদবি পরিবর্তন হয় কিন্তু দায়িত্ব একই থাকে।

সহকারী এনফোর্সমেন্ট কো-অর্ডিনেটর/ সহকারী জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার অথবা সহকারী হিসাবরক্ষক পদ থেকে এজিএম পদে পদোন্নতির জন্য ১৪ বছর নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তা ১৯ থেকে ২০ বছর অতিবাহিত হয়। এজিএম থেকে ডিজিএম পদে পদোন্নতির জন্য সাত বছর নির্ধারিত থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ১০ থেকে ১৩ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। বিলিং সুপারভাইজার, অফিস সেক্রেটারি, ক্যাশিয়ার, স্টোর কিপার, মিটার টেস্টিং সুপারভাইজার পদগুলোতে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার নিমিত্তে কর্মকর্তা পর্যায়ে প্রয়াজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। আর এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিআরইবি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া আরইবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠ পর্যায়ে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে কমিটি বলছে, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইন ২০১৩ এর পরিপ্রেক্ষিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর জন্য নিয়োগ বিধি/প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হলে বদলি পদায়ন, পদমর্যাদা এবং পদোন্নতি-বিষয়ক জটিলতা দূর করা সম্ভব।

কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনার নিমিত্তে ১৩ জুলাই বিআরইবি পুনর্গঠন বিষয়ে সুপারিশ পর্যালোচনায় পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয় সেগুলো হলো— স্থিতিবস্থা বজায় রাখা, বিআরইবি এবং পবিসকে একটি এক সত্তায় একীভূত করা, পবিস স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধার করা, বিআরইবি তদারকিসহ জোনাল কোম্পানি এবং বিআরইবিকে সহায়তা সংস্থা হিসেবে ব্যবহার করে জোনাল কমিটি গঠন করার সুপারিশ করা হয়।

গত বছরের ২৬ নভেম্বর তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে বাপবিবো ও সমিতির মধ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাপবিবো ও পবিসগুলোর মধ্যে সৃষ্ট অসন্তোষ দূরীকরণে বিভিন্ন বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর পদেক্ষপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরে ডিসেম্বর মাসে দুই দফা বৈঠক শেষে জানুয়ারি মাসের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় কমিটি। এতে বিআরইবি ও পবিসকে একীভূত না করার ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়। ফলে পবিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

পর্যালোচনা কমিটিতে আরইবি ও পবিসকে একীভূতকরণের সুপারিশ করা হলেও কেনো চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা প্রতিফলন হয়নি জানতে চাইলে পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক বিদ্যুৎ বিভাগের প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্তি সচিব মো. সবুর হোসেন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘পর্যালোচনা শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেনো পবিসকে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, সেটা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার কথা বলার ইখতিয়ার নেই।’ সার্বিক বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘সমিতির পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রদানের জন্য একটি সভা বা পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল। এই পর্ষদ সই বা স্বাক্ষরের বিষয়ে কাজ করছিল, কিন্তু যখনই কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথা আসত, তা দেওয়া হতো না। এভাবে কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। এর মধ্যেই আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে।’

তিনি জানান, দীর্ঘদিনের এই বিরোধ মেটাতে রাষ্ট্রপক্ষও সফল হয়নি। এ নিয়ে সমিতি একটি তদন্ত করেছে এবং সেই তদন্তের প্রতিবেদনে দুই ধরনের সই পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রপক্ষ কর্মীদের বেতন বাড়ালেও পবিসের কর্মীদের মধ্যে বেতনের একটি অসমতা বা বৈষম্য তৈরি হয়েছে।’ এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. এম শামসুল আলম।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যে নিয়ম বা মাধ্যম অনুসরণ করার কথা ছিল, তা উপেক্ষা করা হয়েছে। গ্রাহকদের মনে ভোগান্তি বা উদ্বেগ তৈরির জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে দায়ী করা হয়েছে। একটি সংস্থায় চাকরির কাঠামোতে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করতে সবাইকে একই চাকরির আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষ এতে রাজি না হওয়ায় সমিতি নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ আদায়ের জন্য আদালতে মামলা করেছে। বর্তমানে সেই মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।