রহমত রহমান: দেশে বৈধপথে স্বর্ণ আমদানি হয় না বললেই চলে। তবুও বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে নিয়ম করে স্বর্ণের দাম বাড়ে, কমে। দাম বাড়ুক আর কমুক, তাতে স্বর্ণ বিলাসীদের মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা ভ্যাট দেওয়াতে। বিলাসী পণ্য স্বর্ণের ক্রেতাকে ভ্যাট প্রদানে উৎসাহ দেন খোদ জুয়েলারি দোকান মালিকরা— এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জুয়েলারি খাতে নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাটও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সঠিকভাবে পায় না। এক তৃতীয়াংশ জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় সম্ভব হচ্ছে না। আবার স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী, স্বর্ণের ব্যবসা করতে ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সদস্যপদ নিতে হয়। নিবন্ধনহীন এসব দোকান বাজুসের সদস্যপদও নেয় না।
বাজুস বলছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ ৩২টি অঞ্চলে অন্তত ২ হাজার ১৬৯টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। এসব প্রতিষ্ঠান মাসে অন্তত ২ কোটি টাকা, বছরে অন্তত ২৬ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৩৩০টি দোকান প্রতি বছর প্রায় ১৪ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে। সেই হিসাবে সারা দেশে অনিবন্ধিত জুয়েলারিগুলো থেকে সরকার বছরে অন্তত ৪০ কোটি টাকার ভ্যাট হারাচ্ছে। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে বাজুস এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকাও দিয়েছে বাজুস।
ওই চিঠিতে বলা হয়, বাজুসের সদস্য না হওয়া এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকির পাশাপাশি আয়করও ফাঁকি দিচ্ছে। এই দোকানগুলো স্বর্ণ চোরাচালান, চুরি ও ডাকাতির স্বর্ণ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশের জুয়েলারি দোকান পর্যবেক্ষণ করে জুয়েলারি দোকানে চুরি, ডাকাতির ঘটনার পেছনে এসব নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পেয়েছে বাজুস। চিঠিতে ভ্যাট নিবন্ধনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এনবিআর বলছে, শুধু ভ্যাট নিবন্ধনহীন জুয়েলারি দোকান নয়, বাজুসের সদস্য প্রতিষ্ঠানও সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় না। জুয়েলারি খাত থেকে প্রতিবছর অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায় সম্ভব, কিন্তু সেখানে মাত্র ১৮০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় হয়।
নিবন্ধনহীন দোকানের নাম, মালিকের নাম, মোবাইল নম্বর, ঠিকানাসহ একটি তালিকা সম্প্রতি বাজুস থেকে এনবিআরে পাঠানো হয়েছে। তালিকা বলছে, গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, উত্তরা থেকে শুরু করে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত দুই হাজার ১৬৯টি ছোট-বড় জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। শুধু ভ্যাট ফাঁকি নয়, এসব দোকানের মালিকরা আয়করও পরিশোধ করেন না। ঢাকার সবচেয়ে বেশি তাঁতীবাজার এলাকার ৫০৫ জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই।
ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন তাঁতীবাজার। এই কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বহু দোকান রয়েছে। আমরা কিছু নিবন্ধন দিয়েছি, বাকি থাকলে নিবন্ধন দেওয়া হবে। তবে জুয়েলারি দোকান থেকে ভ্যাট আদায় কষ্টসাধ্য।’ এই কমিশনারেটের আওতাধীন অভিজাত ধানমন্ডি এলাকায় ১৫টি, বায়তুল মোকাররাম মার্কেটে একটি, ঝিগাতলায় ১০টি, কামরাঙ্গীরচর ৬৪টি, কাওরানবাজার ৩৮টি, জুরাইন ৪৫টি, হাজারীবাগ ১৭টি, লালবাগ ৬০টি, মগবাজার ৩৬টি, মৌচাক ৩০টি, নিউমার্কেট ১২টি, নন্দীপাড়া ১৪টি, রামপুরা ৪৫টি, বনশ্রী ২৪টি, বাসাবো ২১টি, খিলগাঁও ১১৪টি, রায়ের বাজার ২৭টি জুয়েলারি দোকানের নিবন্ধন নেই।
বাজুসের তালিকায় নিবন্ধনহীন দোকানের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিরপুর এলাকা। ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন মিরপুর এলাকার ৩৭৩টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। ঢাকা ভ্যাট পশ্চিমের একজন কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘নিবন্ধনহীন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান থাকার কথা না। এরপরও আমরা টাস্কফোর্সের আওতায় যে ১৪টি কাইটেরিয়া ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে স্পেশালভাবে আমরা এই জুয়েলারি দোকানের নিবন্ধন ও ভ্যাট আদায়ের জন্য কাজ করব।’
এই কমিশনারেটের আওতাধীন অভিজাত মোহাম্মদপুর এলাকায় ৯৭টি, কল্যাণপুর ৮টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। তৃতীয় অবস্থানে ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন অভিজাত গুলশান এলাকার ৪০টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। এছাড়া যমুনা ফিউচার পার্কের একটি, নর্দার দুটি, বাড্ডার ৯০টি, খিলক্ষেত ১৯টি, মহাখালী একটি ও উত্তরার ৪৯টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাধীন যাত্রাবাড়ী এলাকার ১০৭টি, ডেমরার ৭৮টি, রাজধানী মার্কেট ১৭টি, শনির আখড়া ১৩টি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি জুয়েলারি দোকান প্রতিমাসে গড়ে ১০ হাজার টাকা ভ্যাট ধরা হয়েছে। সে হিসাবে ঢাকার ভ্যাট নিবন্ধনহীন এই ২ হাজার ১৬৯টি দোকানে প্রতিমাসে ভ্যাট আসার কথা প্রায় ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা এক বছরে দাঁড়ায় প্রায় ২৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর আগে বাজুস ঢাকা বিভাগসহ ৪১টি জেলার ভ্যাট নিবন্ধনহীন ২ হাজার ৩৩০টি জুয়েলারি দোকানের তালিকা এনবিআরকে দিয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান মাসে ৫ হাজার টাকা হিসাবে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা, আর বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেয়।
বাজুসের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা শহরে তাদের নিবন্ধিত সদস্য দোকানের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ বেশি। আর ঢাকাসহ সারা দেশে ৪০ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। প্রতি দোকান থেকে মাসে গড়ে ১০ হাজার টাকা করে ভ্যাট হলে প্রতি মাসে ভ্যাট আসার কথা প্রায় ৪০ কোটি টাকা। আর বছরে ভ্যাট আসার কথা ৪৮০ কোটি টাকা। তবে এনবিআরের হিসাব বলছে, জুয়েলারি খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় হয়, যা প্রতিমাসে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বাজুসের নিবন্ধিত সদস্যরাও সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় না। সঠিকভাবে ভ্যাট দিলে মাসে ১৫ কোটি টাকা নয়, ৩৭ কোটি টাকা আদায় হতো। স্বর্ণ কিনতে গেলে দোকান থেকে ক্রেতাকে বলা হয় ‘ভ্যাট লাগবে না। ভ্যাট ছাড়া স্বর্ণ কেনা যায়। সেজন্য ক্রেতারা ভ্যাট দিতে উৎসাহ বোধ করেন না।’ আবার ঢাকাসহ সারা দেশে ভ্যাট নিবন্ধনহীন ছোট-বড় অন্তত ৫ হাজার জুয়েলারি দোকান রয়েছে। প্রতি দোকান ৫ হাজার টাকা করে ভ্যাট হলে প্রতিমাসে ভ্যাট দাঁড়ায় আড়াই কোটি টাকা। আর বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
এই বিষয়ে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সারা দেশে জুয়েলারি দোকান থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৮০ কোটি টাকা ভ্যাট আসে। অথচ যে পরিমাণ দোকান রয়েছে, তা থেকে অন্তত এক হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব। বাজুস থেকে ভ্যাট নিবন্ধনহীন ঢাকার একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে, তা মাঠে পাঠানো হবে। ভ্যাট অফিস প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন চেক করে ব্যবস্থা নেবেন। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ছোট ছোট জুয়েলারি দোকানগুলো তো ভ্যাট দেয় না। এমনকি বাজুসের নিবন্ধিত অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয় না। বড় দোকানও ভ্যাট চালান দেয় না।’
এই রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, এখন ৫ শতাংশ হারে আড়াই লাখ টাকা হারে ভরি প্রতি সাড়ে ১২ হাজার টাকা ভ্যাট আসে। বাজুস যুক্তি দেয়, ভরি প্রতি ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে দিলে সব দোকান ভ্যাট দেবে। স্বর্ণ তো একটি বিলাসী পণ্য। যে আড়াই লাখ টাকার স্বর্ণ কিনে, তার সাড়ে ১২ হাজার টাকা ভ্যাট দেওয়ার সক্ষমতা আছে। স্বর্ণের দোকানে যেহেতু ভ্যাট না দিয়ে পার পাওয়ার অপশান আছে, সেজন্য ক্রেতা ভ্যাট না দেওয়ার এই সুযোগ খোঁজেন, আর ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগ দেন। স্বর্ণের দোকানে এনফোর্সমেন্ট স্ট্রং করলে সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় সম্ভব।
এনবিআরে দেওয়া চিঠির বিষয়ে বাজুসের প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘তালিকার ২১৬৯টি জুয়েলারি দোকান ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকির সঙ্গে জড়িত। সম্ভবত এসব প্রতিষ্ঠান চোরাচালান ও অবৈধ বিক্রির সঙ্গে জড়িত। কারণ আমাদের প্রায় দোকানে চুরি ও ডাকাতি হয়। এই চুরি-ডাকাতির মাল কোথায় যায়, কারা কেনেন? কেউ না কেউ তো কেনেন। তাদের প্রতি আমাদের সন্দেহের তীর এই কারণে যে তাদের কোন লাইসেন্স নেই। শুধু একটা নাম দিয়ে বসে ব্যবসা করেন। তারা কোন ভ্যাট, ট্যাক্স দেয় না। এমন কি বাজুসের সদস্যও না। তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমাদের এই চেষ্টা।’
তিনি আরও বলেন, ‘কী পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দেয় তা সেভাবে হিসাব করা হয়নি। তবে ২ হাজার ৫০০ দোকানের প্রতিটি যদি মাসে ১০ হাজার টাকা করে ভ্যাট ফাঁকি দেয়, তাহলে মাসে আড়াই কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি হয়। আমরা চাই, সব ব্যবসায়ী লাইসেন্স নিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করুক।’


