ড. মো. মোস্তফা আলী
বর্তমান সরকার গত ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় খাল খননের মাধ্যমে ‘খাল খনন কর্মসূচি-২০২৬’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে। একই সঙ্গে এ সময় ভার্চুয়ালি দেশের অন্যান্য ৫৩টি জেলার খাল খনন কর্মসূচিরও উদ্বোধন করা হয়। এর মাধ্যমে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলো। এই প্রকল্প অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও পানিসম্পদের সুষম ব্যবস্থাপনা হতে পারে বলে তাত্ত্বিকভাবে ধারণা করা যায়।
বাংলাদেশের আবহাওয়ার দিকে যদি দেখি তবে আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বরে)। বাকি বৃষ্টিপাত এরও বেশিরভাগ প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ-এপ্রিল-মে) ও বর্ষা পরবর্তী মৌসুমে (অক্টোবর-নভেম্বর) হয়ে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে (নভেম্বর-মার্চ) বৃষ্টিপাত এক প্রকার হয় না বললেই চলে। ফলে আমাদের নদীগুলোয় বছরের সাত মাস প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পানিপ্রবাহ থাকে আবার আরেক দিকে বাকি পাঁচ মাস নদী, নালা, খাল, বিলগুলোয় এক প্রকার পানি থাকে না বললেই চলে। বর্ষাকালের এই অতিরিক্ত পানি আমাদের অজস্র নদী ও খালবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে।
আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চল ব্যতীত বাকি এলাকা মূলত সমতল ভূমি হওয়ায় চাইলেও আমরা বর্ষার এই অতিরিক্ত পানি বিশাল জলাধার বা বাঁধ বানিয়ে সংরক্ষণ করে রাখতে পারি না। তাই আমাদের একমাত্র উপায় হচ্ছে সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খাল, বিল, হাওড়, বাওড় ও পুকুরসহ সব নিচুভূমি ও জলাভূমিতে পানিকে সর্বোচ্চ সময় ধরে রাখা। যদি আমরা বর্ষার এই পানিকে ধরে রাখতে পারি, তাহলে আমাদের একাধিক উপকার হবে।
সমস্যা হচ্ছে, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যজনিত কারণে এই জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি ধারণক্ষমতা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমে গিয়েছে। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে অন্যতম কারণ পলি জমে ভরাট হওয়া আর মনুষ্যজনিত কারণ বর্জ্য দ্বারা ভরাট করা কিংবা বসতবাড়ি করার উদ্দেশ্যে খাল ও নদী দখল করা ও মাটি দিয়ে ভরাট করা। নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলো ভরাটের কারণে বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি জলাশয়গুলোয় যেতে পারে না। তাই খালগুলো খনন করা হলে অবশ্যই সামগ্রিক পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনার উন্নতি হবে। এ খালগুলো একদিকে যেমন বন্যার সময় নদীর পানিকে জলাশয়ে নিয়ে যায় আবার একই খাল অতি বৃষ্টির সময় শহরাঞ্চলের পানি নদী বা জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে শহরাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সহায়তা করে। তাই শহরাঞ্চলের ভেতরের কিংবা চারপাশের খালগুলো খনন করা হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশেই দূর হবে।
সবধরনের প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে এই খনন কর্মসূচিকে কার্যকর ও টেকসই করতে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন অপরিহার্য। এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে হাইড্রো-মরফোলজিক স্টাডির ভিত্তিতে। এতে খাল খননের অগ্রাধিকার, স্লুইস গেইট বা ব্যারেজ জাতীয় হাইড্রোলিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, খননকৃত মাটির ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ক্যাপিটাল ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং এর বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে এটি বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট কারিগরি নির্দেশনা ও কার্যকর সুপারিশ প্রদান করা প্রয়োজন। এসব সুপারিশ অবশ্যই পানিসম্পদ সম্পর্কিত বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং প্রতিটি সুপারিশই কোন্ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছে তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করতে হবে।
‘বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩’ খালকে জলপ্রবাহের পথ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে খাল, বিল, হাওড়, বাঁওড়, পুকুর, হ্রদ, বন্যাপ্রবণ ভূমি, জলাভূমি ও তটভূমিকে জাতীয় পানি সম্পদের সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে খাল ও জলাভূমি খনন একটি আইনগতভাবে নিয়ন্ত্রিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় পড়ে। এর গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয় নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা ও বন্যা ব্যবস্থাপনায়, বিশেষ করে যখন খাল খননের মাধ্যমে খাল ও নদীর স্বাভাবিক সংযোগ পুনঃস্থাপন, দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার, খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেইনের নিষ্কাশন কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জলাভূমির পানিধারণ ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা হ্রাস সম্ভব হয়।
‘জাতীয় পানি নীতি-১৯৯৯’ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে, আর ‘জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ নদীপথের নাব্যতা ও সঠিক নিষ্কাশন বজায় রাখতে পলি অপসারণের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের ওপর জোর দেয়। কৌশলগত দিক বিবেচনায়, ‘বাংলাদেশ ডেল্টা পরিকল্পনা (বিডিপি) ২১০০’ আরও কার্যকরী বাস্তবায়ন কাঠামো প্রদান করে, যেখানে জলাবদ্ধতা, অকার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং জলাভূমি দখলকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং সেসব খালের সঙ্গে সংযুক্ত ড্রেইনের নিষ্কাশন ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে খাল ও জলাভূমি খননকে অভিযোজনভিত্তিক বা অ্যাডাপ্টিভ ডেল্টা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩–২০৫০)’ জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা, প্রতিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই কর্মসূচির জন্য একটি ভিত্তি প্রদান করে।
যদিও এসব আইন ও নীতিমালা পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বেশকিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করে, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বর্তমান চ্যালেঞ্জের সঙ্গে আর পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, কারণ সেগুলো যথেষ্ট পুরোনো হয়ে গিয়েছে। ফলে একটি সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা এখন স্পষ্ট। বিডিপি ২১০০ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কাঠামো প্রদান করলেও এটি মূলত পূর্ববর্তী নীতিমালার সংকলন বৈকি এবং বর্তমান সময়ের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উদীয়মান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নির্দেশনা প্রদান করে না। এ কারণে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) উচিত খাল ও জলাভূমি খননের জন্য একটি স্বতন্ত্র মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা, যা কারিগরি, হাইড্রোলজিক, পরিবেশগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলোকে সমন্বিত করবে। এই মাস্টার প্ল্যান সর্বশেষ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মূল্যায়ন রিপোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে খাল খনন, খাল পুনরুদ্ধার, জলাভূমি খনন ব্যবস্থাপনা, ড্রেইন নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা, পরিবর্তনশীল জলবায়ুগত ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। একই সঙ্গে ভূপৃষ্ঠস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বিবেচনায় এনে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, পানির বিশুদ্ধতা, নিরাপত্তা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মোট ৫৭টি ট্রান্সবাউন্ডারি বা আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে, যার মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে এবং ৩টি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানায় প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শুধুমাত্র গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি রয়েছে যা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত। তবে এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন মাসে শেষ হয়ে আসবে। এ প্রেক্ষাপটে গঙ্গা চুক্তির নবায়নের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর জন্যও পানি বণ্টন ও অববাহিকা ব্যবস্থাপনা বিষয়ক শক্তিশালী আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি পানি বণ্টনজনিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিকল্পনা, সূচনা ও বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় জনগণ ও স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততা শুধু গ্রহণযোগ্যতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে না, বরং সাধারণ মানুষের চাহিদা, স্থানীয় খাল ও জলাভূমির বাস্তবচিত্র এবং প্রস্তাবিত নীতিমালার কার্যকরী প্রভাব সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের আরও স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে।
নিচে ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
১) খালের অফটেক বা মুখ, যেখানে নদীর সঙ্গে মিলিত হয় বা নদীর শাখা-বিভাজন অংশে পানিপ্রবাহের গতি প্রায়শই কমে যায়, যার ফলে পলি জমা হয় এবং নিষ্কাশন সক্ষমতা হ্রাস পায়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য অফটেক ব্যবস্থাপনা এবং উপযুক্ত পলি নিয়ন্ত্রণ বা ড্রেজিং ব্যবস্থাপনার কাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে নদী বা খালের হাইড্রোলিক কার্যকারিতা বজায় থাকে।
২) খালের অফটেকের এলাইনমেন্ট এবং হাইড্রোলিক বৈশিষ্ট্য সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা করা উচিত, কারণ অফটেকের অবস্থান পরিবর্তন পলি জমার প্রবণতা বাড়ায় এবং পানিপ্রবাহের ক্ষমতা হ্রাস করে।
৩) খাল ও নদী বা অন্যান্য জলাভূমির মধ্যে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে স্লুইস গেট, রেগুলেটর এবং পাম্পিং স্টেশনসহ উপযুক্ত হাইড্রোলিক স্থাপনার কথা বিবেচনা করতে হবে।
৪) ড্রেজিং এর সময় খননকৃত পলি উপযুক্ত স্থানে অপসারণ ও সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে, যাতে তা পুনরায় খালে প্রবেশ না করে বা প্রবাহে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে।
৫) ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং এবং পর্যায়ক্রমিক পুনঃখনন প্রয়োজন, যাতে ডিজাইনগত কার্যকারিতা বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়।
৬) খননের পূর্বেই খালের সীমানা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও সুরক্ষিত করতে হবে। খাল পাড়ে গ্রিন বাফার প্রযুক্তির আওতায় হাঁটার পথ গড়ে তোলা হলে ভবিষ্যতে খাল দখলজনিত সম্ভাবনায় তা প্রতিরোধ হিসেবে সহায়তা করতে পারে।
৭) খাল খননের আগে অববাহিকা-স্তরের মূল্যায়ন করা আবশ্যক, যেখানে মাটির অবস্থা, পানিপ্রবাহ এবং হাইড্রো-মরফোলজিক স্টাডি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
৮) খনন প্রকল্পগুলোকে বৃহত্তর অববাহিকা বা জলাভূমিভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে।
৯) এমনভাবে খালের মরফোলজিক্যাল ডিজাইন নির্ধারণ করতে হবে যাতে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিরাপদে পরিবাহিত হতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করা যায়। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নৌ-চলাচলের প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
১০) ডিজাইন অনুযায়ী খনন কার্যক্রম যথাযথভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি বা অপব্যবস্থাপনা হ্রাসের জন্য শক্তিশালী তদারকি, জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১১) বাস্তবায়নের পূর্বে সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবসমূহ মূল্যায়ন করা আবশ্যক, যার মধ্যে পানির গুণগতমান, জলজ আবাসস্থল এবং সামগ্রিক পরিবেশগত অবস্থার উপর প্রভাব বিবেচনায় আনতে হবে।
১২) খাল ও জলাভূমি খনন কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি স্বতন্ত্র ও সময়োপযোগী মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা উচিত, যা বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা দ্বারা সমর্থিত থাকবে। এই পরিকল্পনায় কারিগরি, পরিবেশগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনাগুলো সমন্বিতভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
১৩) গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর জন্য পানি বণ্টন ও অববাহিকা-স্তরের ব্যবস্থাপনা চুক্তি এগিয়ে নিতে আইনগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগ জোরদার করা উচিত, যাতে দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় সীমানার মধ্যে পানিবণ্টন সম্পর্কিত কূটনৈতিক সহযোগিতা আরও ভালো হয়।
১৪) পরিকল্পনা ও ডিজাইনজনিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বশেষ বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মূল্যায়নভিত্তিক রিপোর্ট ব্যবহার করা উচিত; যাতে খনন, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাভূমির পানি ধারণ ব্যবস্থা, বন্যা ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন জলবায়ুগত অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের মধ্যেও কার্যকর ও স্থিতিশীল থাকে।
১৫) খনন নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো একটি সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভূপৃষ্ঠস্থ পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
১৬) সর্বোপরি পরিকল্পনা, ডিজাইন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে জনসাধারণ ও স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে তা মানুষের চাহিদা এবং খাল ও জলাভূমির পরিবেশগত বাস্তবচিত্র সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের আরও স্পষ্ট ধারণা প্রদান করে এবং প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
১৭) ‘জাতীয় পানি নীতিমালা-১৯৯৯’ এবং ‘বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩’কে বর্তমান সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিসম্পদ, পরিবেশগত দিক, ট্রান্স-বাউন্ডারি ইস্যু, সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক বিষয়সমূহ বিবেচনায় নিয়ে নুতন যুগোপযোগী পানি আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক, পানিসম্পদ কৌশল বিভাগ, বুয়েট
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]


