নোভারটিস কর্মীদের পাওনা পরিশোধে গড়িমসি রেডিয়েন্ট ফার্মার
  • কর্মীদের পাওনাসহ নোভারটিসের ৬০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় রেডিয়েন্ট
  • বকেয়া বেতন ও গ্র্যাচুইটিসহ ৪০ কোটি টাকার বেশি পাওনা
  • বকেয়া পরিশোধে আদালতের রায় মানছে না রেডিয়েন্ট ফার্মা

সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর ওষুধ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি নোভারটিসের ৬০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় দেশি কোম্পানি রেডিয়েন্ট ফার্মাসিটিক্যালস। শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, নোভার্টিসের কর্মরতদের চাকরি যাবে না। স্থায়ী ও সার্বক্ষণিক কর্মীরা একই বেতনে রেডিয়েন্ট ফার্মায় চাকরি করতে পারবেন। কিন্তু হস্তান্তর শেষ হওয়ার পর নোভারটিসের কর্মীদের ছাঁটাই শুরু করা হয়। উপরন্তু কোম্পানি যে ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ ঘোষণা করে, তা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনার চেয়ে অনেক কম। ‘অপর্যাপ্ত ও বৈষম্যমূলক’ ক্ষতিপূরণ চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন শ্রমিকেরা। বিচার শেষে শ্রমিকদের পক্ষে রায়ও দিয়েছেন আদালত। কিন্তু রেডিয়েন্ট ফার্মা রায় মানছে না। এরপর মন্ত্রণালয়ে দ্বারস্থ হয়েও সমাধান না পেয়ে আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিকরা।  

শ্রমিকরা জানান, রেডিয়েন্ট ফার্মা কোনো পাওনা পরিশোধ না করে তাদের ৪৫ জনকে চাকরিচ্যুত করে। তাদের বকেয়া বেতন, গ্র্যাচু্ইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও মেডিকেল ভাতাসহ নোভারটিসে পাওয়া সব সুবিধা ধরে ৪০ কোটি টাকার বেশি হবে। ছাঁটাইয়ের শিকার সিনিয়র মেডিকেল অফিসার মো. মিসকাতুর রহমান মামুন জানান, শেয়ার হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর স্থায়ী কর্মীদের জন্য কোম্পানি কিছু ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ ঘোষণা করে। তবে তা ছিল ‘অপর্যাপ্ত ও বৈষম্যমূলক’। শ্রমিকেরা তখন ৮৪ মাসের ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেন। একপর্যায়ে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। 

হাইকোর্ট শ্রমিকদের পক্ষে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। এতে চাকরি বহাল রাখা এবং শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত রাখার কথা বলা হয়। পরে চাকরি ও সুবিধা বহাল রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও গত বছরের সেপ্টেম্বরে কারণ দর্শানো ছাড়াই ৪৫ জন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর মন্ত্রণালয়ের সমঝোতার উদ্যোগ নিলেও কোম্পানির অনাগ্রহের কারণে সফল হয়নি। তবে এক পর্যায়ে শ্রম মন্ত্রণালয় ১২ দফা নির্দেশনা জারি করে।

মিসকাতুর রহমান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘কোম্পানি টারমিনেট করছিল ৪৬ জনকে। এর মধ্যে একজন ব্যক্তিগতভাবে কোম্পানির সঙ্গে মিউচুয়াল করে। এখন আমরা পাওনার তালিকায় রয়েছি ৪৫ জন। যাকে পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে, তিনি মূলত কোম্পানির এজেন্ট ছিল।’  

নথিপত্র থেকে জানা যায়, ৮৪ মাসের দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শেয়ার হস্তান্তর না করার জন্য কোম্পানিকে নির্দেশ দিতে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ভুক্তভোগী কর্মীরা শ্রম মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো উত্তর বা কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা হাইকোর্টে রিট মামলা করেন। হাইকোর্ট কর্মীদের পক্ষে দুই মাসের স্থগিতাদেশ দেন। এরপর ১ জুন কর্মীদের পক্ষেই মামলা নিষ্পত্তি করে রায় দেন আদালত। কিন্তু রায় প্রকাশের আগেই কোম্পানি শেয়ার ও জনবল হস্তান্তর শুরু করে। ২১ জুলাই রেডিসন ব্লুতে সভার আয়োজন করা হলেও মামলায় সংশ্লিষ্ট ৪৬ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনকি ২৯ ও ৩০ জুলাই কোম্পানি তাদের বাদ দিয়ে বাকি জনবল স্থানান্তর সম্পন্ন করে। ২৬ আগস্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। সেখানে কোম্পানিকে ১৫ দিনের মধ্যে বিষয়টির সুরাহার আদেশ দেওয়া হয়, কিন্তু তা না করে ১৮ সেপ্টেম্বর ৪৫ জনকে ছাঁটাই করে দেয়।

২১ সেপ্টেম্বর ভুক্তভোগীরা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ছাঁটাই আদেশ বাতিল ও ৮৪ মাসের বেতনসহ বাকি সুবিধাদি পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে আবেদন জানানো হয়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা এক নোটিশের মাধ্যমে শ্রমিকদের বকেয়া, ক্ষতিপূরণ ও সুবিধা নিয়ে সভা আহ্বান করা হয়। সভায় রেডিয়েন্টের চেয়ারম্যান, নতুন করা কোম্পানির এমডিকে আসতে বলা হয়। কিন্তু রেডিয়েন্ট তাদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে লে. জেনারেল (অব.) সিনহা ইবনে জামালিকে প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে আরেকটি চিঠি পাঠায়। ৬ অক্টোবর সভায় সিনহা উপস্থিত থাকলেও নেভিয়ানের (নোভারটিসের ৬০ শতাংশ শেয়ার নিয়ে গঠিত নতুন কোম্পানি) এমডি আসেননি।

ওই সভায় হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে দাবি নিষ্পত্তির জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। কমিটিতে মালিকপক্ষের তিনজন প্রতিনিধি, শ্রমিকদের তিন প্রতিনিধি, বিসিআইসি প্রতিনিধিসহ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ২০ অক্টোবর কমিটির সভার নোটিশ জারি হয় এবং ২২ অক্টোবর সভা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ওই সভায় সিনহার বদলে রেডিয়েন্টের পরিচালক মোহাম্মদ নজরুল্লাহ উপস্থিত হন। সেখানে দ্রুত আরেকটি সভা করা, কোম্পানি শেয়ার ট্রান্সফারের অ্যাগ্রিমেন্টসহ সব কাগজপত্র আনতে বলা হয়। ১৯ নভেম্বর দ্বিতীয় সভায় সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজাদি কোম্পানি প্রদান করেনি, তাই কমিটির মাধ্যমে নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। পরে চূড়ান্ত সমঝোতার বিস্তারিত হিসাব বিবরণী চেয়ে অনুরোধ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি কোম্পানি থেকে। এরপরও মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার চিঠির উত্তর পাওয়া যায়নি। উল্টো কর্মীদের কাছে থাকা অ্যাসেট (বাইক, অফিস আইডি ইত্যাদি) ফেরত চায় কোম্পানি। 

সর্বশেষ গত ৫ ফেব্রুয়ারি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কোম্পানি কর্তৃক ঘোষিত প্যাকেজ-৩ অনুযায়ী অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে ছয় মাসের গ্রস স্যালারি, প্রতি বছর চাকরির জন্য মূল বেতনের দেড় গুণ হারে প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা, শ্রম আইন, ২০০৬ এর ধারা-২৮ অনুযায়ী চাকরির অবসানজনিত কারণে কোম্পানির নিয়মিত অবসরজনিত সুবিধাসহ ধারা ২৬৪ অনুসারে প্রদেয় ভবিষ্য তহবিলের (সিপিএফ ১৫ শতাংশ) সমুদয় অর্থ এবং ধারা ৩৩ (১) অনুযায়ী টার্মিনেশন বিধিসম্মত না হওয়ায় অদ্যাবধি সব মাসের বকেয়া মজুরি ও ভাতাদি প্রদানের কথা বলা হয়। এছাড়া ছুটির নগদায়ন (যদি থাকে), বকেয়া বোনাস (যদি থাকে), রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের এফিডেভিট অনুযায়ী শ্রমিকদের চাকরি অন্তত তিন বছর বহাল রাখলে তার ক্ষতিপূরণ বাবদ এ সময়কালের আইনানুগ আর্থিক পাওনাদিসহ, ধারা-৩০ অনুযায়ি ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে বর্ণিত সব পাওনা পরিশোধের কথাও বলা হয়। 

৯ ফেব্রুয়ারি শ্রম আইন অনুযায়ী ১২টি নির্দেশনা ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নোভারটিস/নেভিয়ান লাইফসায়েন্স কর্তৃপক্ষকে পত্রও প্রেরণ করা হয়। কিন্তু এই ১৫ কার্য দিবস শেষ হয়ে যাওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকে মানা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘কোনো বিদেশি কোম্পানি শেয়ার হস্তান্তরের সময় দেশের শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে শ্রমিকেরা অভিযোগ করছেন। শ্রম মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির উদ্যোগ না নেওয়া উদ্বেগজনক এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি।’

এদিকে শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আগামী ১২ এপ্রিল সভায় আসতে নেভিয়ান লাইফসায়েন্সের কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক মো. শফিউল্লাহ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘এ দিন কোম্পানি এবং কর্মীদের মধ্যে একটা ফাইনাল সেটেলমেন্টের বিষয়ে আলোচনা করা হবে। আসলে বিষয়টি নিয়ে আমাদের কাছে প্রথম দিকে এলে আমরা এ নিয়ে আগে থেকেই কাজ করতাম। উনারা কোর্ট, মন্ত্রণালয় এসব জায়গায় আগে চলে গিয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে কোনো সমাধান না হলে তারপর সেখানে যাওয়া হয়। এখন আমরা চাইব খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টার একটা ফয়সালা করতে।’ 

এসব অভিযোগের বিষয়ে রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এবং নেভিয়ান লাইফসায়েন্সের সিওও নকিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ফোন নম্বরে একাধিকবার কল ও এসএমএস পাঠিয়ে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।