পবিত্র হজ ও উমরা কেবল কাবা শরিফ তাওয়াফ বা সাফা-মারওয়া পাহাড়ে দৌড়ানোর মতো কিছু আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। এটি মূলত আত্মা ধৌত করার এক আধ্যাত্মিক যাত্রা। কাবার কালো গিলাফ ধরে মানুষ যখন কাঁদে, তখন সে আসলে নিজের ভাঙা মনকে জোড়া লাগায়। আর মদিনার শান্ত বাতাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার যে অমিয় ধারা সিক্ত হয়, তা মুমিনের জীবনকে আমূল বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হজ বা উমরার সফরে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সমতা। ইহরামের সেই সাদা দুই টুকরো সেলাইবিহীন কাপড় ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় কাফনের কাপড়ের কথা, যেখানে পার্থিব কোনো পদবি বা জাঁকজমকের স্থান নেই। ইহরাম পরা মানে হলো নিজের দুনিয়াবি অহংকার আর আভিজাত্যকে বিসর্জন দিয়ে মহান আল্লাহর কাছে একজন সাধারণ বান্দা হিসেবে নিজেকে সঁপে দেওয়া।
দুর্ভাগ্যবশত, অনেকে এই পবিত্র সফরে গিয়েও নিজের সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস ভুলে থাকতে পারেন না। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেকে আশা করেন যে তার লাগেজ অন্য কেউ টেনে দেবে, বাসে কিংবা খাবারের টেবিলে তিনি অগ্রাধিকার পাবেন, কিংবা উন্নত মানের রুমটি কেবল তারই প্রাপ্য। মক্কা-মদিনার পুণ্যভূমিতে এসেও যখন কেউ আমি কে, জানেন?—এই মানসিকতা পোষণ করেন, তখন তিনি হজের মূল আধ্যাত্মিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হন। আল্লাহর দরবারে এসব বৈষয়িক পরিচয়ের কোনো কানাকড়ি মূল্য নেই।
হজ ও উমরার ময়দান আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, বাংলার সহজ-সরল কোনো কৃষক, সুদূর আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ কোনো ভাই, ইউরোপের বিত্তশালী কিংবা ইন্দোনেশিয়ার কোনো হাজি—সবাই আল্লাহর আমন্ত্রিত মেহমান। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে বেছে নিয়েছেন তাঁর ঘরের মেহমান হিসেবে। সেখানে সবাই সমান। যখন একজন মানুষ নিজের অহংকারের বোঝা নামিয়ে ফেলেন, তখন তাওয়াফের ক্লান্তি কিংবা মরুভূমির তপ্ত রোদও তার কাছে মধুর মনে হয়।
সফল সফর সেটাই, যেখানে মানুষ নিজের পদবি, পেশা এবং আভিজাত্যকে দেশের সীমানায় ফেলে রেখে আসে। আল্লাহর রাস্তায় কেউ সিইও নয়, কেউ ভিআইপি নয়; সবাই কেবল তাঁর রহমতপ্রত্যাশী ভিখারি। বিনয়ই হলো এই সফরের মূল পাথেয়। কারণ, দয়াময় আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই বেশি সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি বিনয়ী।
আমরা যদি উমরা ও হজের এই আধ্যাত্মিক এবং বুদ্ধিভিত্তিক শিক্ষাগুলো জীবনে ধারণ করতে পারি, তবেই আমাদের আখেরাতের পথ সহজ হবে। জীবন হোক সুন্নাহসম্মত ও অহংকারমুক্ত, তবেই আমাদের এই মহতি ইবাদত সার্থক হবে।
জা.অর্থনীতি/ উমর

