আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের জেরে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাহের আল-বাউরকে তাঁর পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল এক বিশেষ আদেশের মাধ্যমে তাঁকে বৈদেশিক প্রতিনিধিত্ব সংক্রান্ত সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে লিবিয়ার পররাষ্ট্রনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই প্রভাবশালী পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আবারও প্রকাশ্যে এলো।
প্রধানমন্ত্রী আবদুলহামিদ দ্বেইবাহকে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, তাহের আল-বাউর এখন থেকে রাষ্ট্রের কোনো সার্বভৌম প্রকৃতির কাজে অংশ নিতে পারবেন না। এর ফলে তিনি লিবিয়ার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার আইনি কর্তৃত্ব হারালেন। মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো অন্যায়ভাবে বৈদেশিক যোগাযোগ এবং প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ব্যবহার করার অভিযোগে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কাউন্সিলের দাবি, মন্ত্রণালয়ের এই ধরণের পদক্ষেপ প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছে এবং যা কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত পূর্ণ মন্ত্রীদের জন্য সংরক্ষিত ক্ষমতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল।
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে লিবিয়ার সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র এবং জেনেভায় অনুষ্ঠিত ‘লিবিয়ান পলিটিক্যাল ডায়ালগ ফোরাম’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছে পরিষদ। তারা জোর দিয়ে বলেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ যেকোনো সার্বভৌম পদে নিয়োগ বা দায়িত্ব প্রদান অবশ্যই আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে এবং কোনো একক পক্ষ একতরফাভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যথাযথ আইনি অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের অনুমতি দিলে তা লিবিয়ার পররাষ্ট্রনীতির সংহতিকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কে কথা বলছেন—তা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রবল ঝুঁকি তৈরি করে।
মধ্যপ্রাচ্যসহ বর্তমানের জটিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে লিবিয়ার বাহ্যিক প্রতিনিধিত্বের ঐক্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছে প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল। তারা জাতীয় ঐক্য সরকারকে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে একজন যোগ্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনোনীত করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে পরিষদ সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী ওই পদটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে। মূলত আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন এই হস্তক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।
লিবিয়ার এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ মূলত দেশটির বিভক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি খণ্ডচিত্র। ২০১১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশটিতে পরস্পরবিরোধী ম্যান্ডেট এবং বিতর্কিত কর্তৃত্ব প্রায়শই শাসনব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সর্বশেষ পদক্ষেপটি একটি ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে লিবিয়ার নেতৃত্বের গুরুত্বকে আবারও সামনে নিয়ে এল। বিশেষ করে যখন দেশটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সচেষ্ট, তখন ক্ষমতার সীমারেখা স্পষ্ট করার এই উদ্যোগ দেশটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরণের বিভাজন রোধে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আপাতত লিবিয়ার এই কূটনৈতিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল।
জেএ/অভি

