ইতিহাসে কিছু মানুষ আসেন, যারা কেবল তাদের যুগের নন, তারা যুগ নির্মাণ করে। আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭–১৯৩৮) তাদেরই একজন। লাহোরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তিনি হয়ে উঠেন উপমহাদেশের মুসলমানদের আত্মার কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন এমন একজন কবি ও দার্শনিক, যার প্রতিটি পঙ্ক্তি ঘুমন্ত উম্মাহকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান বহন করে।
শৈশব ও শিক্ষা
মুহাম্মদ ইকবাল ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত, যারা কয়েক পুরুষ আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। পিতা শায়খ নূর মুহাম্মদ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সুফিপ্রবণ মানুষ। তার ধার্মিকতার ছায়া ইকবালের মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিয়ালকোট মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি লাহোরের গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হন, যেখানে প্রাচ্যবিদ ও দার্শনিক স্যার টমাস আর্নল্ডের সান্নিধ্যে তার মেধা পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। আর্নল্ডের উৎসাহেই তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯০৫ সালে তিনি কেমব্রিজে দর্শন পড়েন, পরে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং লন্ডনে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। পশ্চিমের জ্ঞান আহরণ করেও তিনি ইসলামের শিকড়ে ফিরে এসেছিলেন— এটিই তাকে করেছিল অনন্য।
কোরআনের সঙ্গে গভীর সংযোগ
ইকবালের চিন্তার শিকড় ছিল কোরআনে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানদের অবনতির মূল কারণ কোরআন থেকে বিচ্ছিন্নতা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’- (সুরা আর-রা’দ, ১৩:১১)।
এই আয়াতটি ছিল ইকবালের দার্শনিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি মনে করতেন, বাইরের শত্রু নয়, ভেতরের দুর্বলতাই মুসলমানের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পথ হলো ‘খুদি’ বা আত্মশক্তির জাগরণ।
খুদি: আত্মার পুনরুজ্জীবন
ইকবালের সবচেয়ে বিখ্যাত দার্শনিক ধারণা হলো ‘খুদি’, যার অর্থ আত্মসচেতনতা, আত্মমর্যাদা ও আল্লাহমুখী আত্মশক্তি। এটি অহংকার নয়; বরং সেই আত্মবিশ্বাস যা মানুষকে আল্লাহর খলিফা হিসেবে দাঁড় করায়।
‘নিজেকে এত উঁচুতে উন্নীত করো যে, প্রতিটি ভাগ্যলিপি লেখার আগে আল্লাহ নিজেই তার বান্দাকে জিজ্ঞেস করেন— বলো, তোমার রেজামন্দি কী?’ (বাল-এ-জিবরিল, আল্লামা ইকবাল)
এই পঙ্ক্তিতে ইকবাল সেই মানুষের কথা বলেছেন, যে নিজেকে এতটাই আল্লাহর রঙে রাঞ্জিত করেছে যে, তার ইচ্ছাই আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে মিলে যায়। এটি কোনো অহংবোধ নয়— এটি আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তর।
উম্মাহর অবনতিতে তার বেদনা
ইকবাল কেবল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বেদনাবিদ্ধ সাক্ষী। উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ মুসলিম উম্মাহকে দেখে তার কলম কেঁদে উঠেছে।
‘তারা দুনিয়ায় সম্মানিত ছিল মুসলমান হওয়ার কারণে, আর তোমরা লাঞ্ছিত হয়েছ কোরআন ছেড়ে দেওয়ার কারণে।’ (বাং-এ-দারা, আল্লামা ইকবাল)
এই দুটি লাইনে ইকবাল পুরো মুসলিম ইতিহাসের নির্যাস তুলে ধরেছেন। মুসলমানের উত্থান ছিল কোরআনের সঙ্গে— পতন এসেছে তা থেকে দূরে সরে গিয়ে। এটি কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক রোগনির্ণয়।
আল্লামা ইকবাল ও ব্রিটিশ বিরোধিতা
আল্লামা ইকবাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাশ্চাত্য উপনিবেশবাদ কেবল রাজনৈতিক দাসত্ব নয়, বরং মুসলমানের আত্মপরিচয় ও ‘খুদি’কেও ধ্বংস করছে। তার কবিতায় তিনি মুসলিম তরুণদের জাগিয়ে তুলেছেন— শৃঙ্খল ভাঙতে, মাথা উঁচু করতে। ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ ভাষণে তিনি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের স্বপ্ন উচ্চারণ করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন।
রেনেসাঁর দিশারি
ইকবাল চেয়েছিলেন ইজতিহাদের পুনরুজ্জীবন— মৌলিক চিন্তা ও গবেষণার দরজা আবার খুলে দেওয়া। তার ‘Reconstruction of Religious Thought in Islam’ গ্রন্থে তিনি যুক্তি দিলেন যে ইসলাম স্থবির নয়, এটি চিরন্তন গতিশীল— শর্ত হলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সৃজনশীল চিন্তার চর্চা।
আল্লামা ইকবাল আজ নেই, কিন্তু তার আহ্বান আজও প্রাসঙ্গিক। যে উম্মাহ নিজের পরিচয় ভুলে গেছে, নিজের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে— তাদের জন্য ইকবালের কবিতা একটি আয়না এবং একটি মশালও একই সঙ্গে।
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

