শান্তি আলোচনায় বিশৃঙ্খলা করেছেন উগ্রমেজাজি ট্রাম্প : ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা বলা’র অভিযোগ তুলেছে ইরান। জানা যায় গত শুক্রবার একগুচ্ছ টুইট বার্তায় ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ বহাল রাখেন। তিনি দাবি করেন যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকার চলাচলের ওপর সব বিধিনিষেধ সম্পূর্ণ তুলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছে। সংক্ষেপে, তিনি এমন একটি ধারণা দেন, যেন ইরান আত্মসমর্পণ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তীব্র ক্ষোভ জানায় তেহরান।

এদিন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। ইসলামাবাদে ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতা মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ শনিবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা বলা’র অভিযোগ তোলেন। তবে তিনি এও বলেন যে কূটনীতির দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি। যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে ট্রাম্প অবরোধ তুলে নিচ্ছেন না, তখন শনিবার ইরান জানিয়ে দেয় যে প্রণালিটি আবারও পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শর্তসাপেক্ষে খুলে দেওয়ার বিষয়টি শেষ হয়েছে।

 বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সবের কোনোটিই মূল সমস্যার সমাধানের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে না; অর্থাৎ ইরানের মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার বজায় রাখার অনড় অবস্থানের সমাধান মিলছে না। প্রকৃতপক্ষে, এ ধাঁধার সমাধান হতে পারে বিষয়টি আপাতত সমাধানের চেষ্টা না করে বরং একটি কাঠামো চুক্তিতে সম্মত হওয়া। যেখানে যুদ্ধের অনুপস্থিতিতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ থাকবে-সম্ভবত ট্রাম্প ও চীনা নেতা শি জিন পিংয়ের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকে।

দিনের শেষে ইরানের ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বিদেশি মিডিয়ার সংবাদ তৈরির বিপরীতে ‘নীরবতা’ বজায় রাখার নীতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হোয়াইট হাউসেও যদি এমন একজন ‘শান্ত আমেরিকান’ থাকতেন, তবে শান্তির পথ হয়তো আরও দ্রুত হতো, এই বোধই এখন প্রবল।

এদিকে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় সোমবার তেহরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে মার্কিন কর্মকর্তাদের পাঠাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তটি বড় এক সংকেত। তেহরানের কাছে এটি স্পষ্ট যে এই কৌশলগত নৌপথ দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবেই রয়ে গেছে। কূটনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশৃঙ্খল আচরণের বিপরীতে তেহরানকে শান্ত ও কৌশলগতভাবে এগোতে হবে, এটি তেহরান বিশ্বাস করে। তারা বুঝে গেছে যে এ দুটি দক্ষতা তাদের মতে ট্রাম্পের একেবারেই নেই।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার অভাব ও সম্পর্কের ধোঁয়াশা এতটাই যে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়, ট্রাম্প কী ভাবছেন। অন্তত এটি অস্বীকার করার উপায় নেই, ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় দফার আলোচনার প্রেক্ষাপট মোটেও অনুকূল ছিল না। এর আংশিক কারণ হলো, ট্রাম্পের অধৈর্য আচরণ। তিনি বারবার পর্যায়ক্রমিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন অথবা ইরানের সংবেদনশীলতার বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না।

গত রবিবার রাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটি শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না। সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা লিখেছে, আলোচনায় না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ওয়াশিংটনের ‘অত্যধিক দাবি, অবাস্তব প্রত্যাশা, বারবার অবস্থানের পরিবর্তন, ক্রমাগত স্ববিরোধিতা ও চলমান নৌ-অবরোধের’ ফল, যাকে তারা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে মনে করছে।পরবর্তী দফার আলোচনায় বসার আগে ইরানের তিনটি শর্ত ছিল-লেবাননে যুদ্ধবিরতি, ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন অবরোধের অবসান এবং ইরানের জব্দ সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি।

ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা একে একটি প্রথাগত কূটনৈতিক ‘ধাপে ধাপে পারস্পরিক বিনিময়’প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছিলেন, যেখানে এক পক্ষের আস্থা বৃদ্ধিমূলক একটি পদক্ষেপ অন্য পক্ষকেও একইভাবে সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।এরই ধারাবাহিকতায়, ট্রাম্পের মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর লেবাননে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেওয়াকে ইরান তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখেছিল। বিনিময়ে ইরানেরও হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ আংশিক শিথিল করার কথা ছিল, যে পদক্ষেপ গত শুক্রবার সকালে অনেকটা হুট করেই টুইট করে জানিয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। আশা করা হয়েছিল, বিনিময়ে ট্রাম্পও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেবেন এবং এভাবে একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হবে।