আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাপান সরকার তাদের কয়েক দশকের পুরনো প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানি সংক্রান্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দেশটির মন্ত্রিসভা এই বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের অনুমোদন দেয়। মূলত আন্তর্জাতিক অস্ত্রের বাজারে প্রবেশ করে নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যেই টোকিও এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাপানের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জানান যে, বর্তমানে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দিন দিন অত্যন্ত জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে আসা ক্রমাগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে জাপানকে তার পুরনো নীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়েছে। তাকাইচি জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে কোনো দেশই এককভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তাই মিত্র দেশগুলোর সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিনিময় ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
জাপানের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একে ‘বেপরোয়া সামরিকীকরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে চীন। বেইজিং এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, জাপানের এই নীতিগত পরিবর্তনে বেইজিং মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন। চীনের মতে, জাপানের এই সামরিক অগ্রযাত্রা এশীয় অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং তারা জাপানের এই বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।
জাপান ১৯৭৬ সালে প্রথম অস্ত্র রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, যার ফলে এতদিন দেশটি কেবল উদ্ধার কাজ বা নজরদারির মতো সীমিত ক্ষেত্রে সরঞ্জাম রপ্তানি করতে পারতো। তবে সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী এখন থেকে সব ধরনের আধুনিক ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিদেশে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। সরকার স্পষ্ট করেছে যে, কেবল সেই সব দেশের কাছেই অস্ত্র রপ্তানি করা হবে যারা জাতিসংঘের সনদ মেনে সরঞ্জামগুলো ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেবে। সরকার দাবি করছে, এই পরিবর্তনের পরেও শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে জাপানের মূল আদর্শ ও ইতিহাস অপরিবর্তিত থাকবে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তে খোদ জাপানের সাধারণ মানুষের মধ্যেই বড় ধরনের অস্বস্তি ও বিরোধিতা দেখা গেছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যম এনএইচকে-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ জাপানি নাগরিক এই পদক্ষেপের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। শান্তি কর্মীদের আশঙ্কা, অস্ত্রের বাজারে প্রবেশ করার ফলে জাপান ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং দেশটির ঐতিহ্যগত ‘শান্তিকামী’ ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অধিকারকর্মীদের মতে, জাপানি অস্ত্র দিয়ে মানুষ হত্যার সম্ভাবনা তৈরি হওয়া দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক নীতি ও নৈতিক অবস্থানের পরিপন্থী।
জেএ/অভি

