ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার: বর্তমান বিশ্বে হরমুজ প্রণালি আবারও এক গভীর ভূরাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালি কার্যত অচল বা সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইরান পুনরায় প্রণালিটি বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বা হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, তারা প্রবেশ করলে আক্রমণের শিকার হবে। ফলে এটি কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয় যা এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথগুলোর একটি করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালিতে এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের শুরুতেই তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ১২০ ডলারের বেশি হয়েছে যা ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরামকো ইতোমধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে যে, দীর্ঘ মেয়াদে এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। তাছাড়া বিকল্প রুট যেমন- পাইপলাইন বা অন্য বন্দরও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে; ফলে নিরাপদ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই সংকট শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে। সরবরাহ সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং এর প্রভাব অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো যেমন- বাংলাদেশ, ভারত বা ইউরোপীয় দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। হরমুজ প্রণালি শুধু তেল পরিবহনের জন্য নয়, বরং খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালি বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে খাদ্য আমদানিতে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে; ফলে খাদ্যের দাম ৪০ থেকে ১২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, কারণ জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেছে এবং বিমা খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ধীরগতির দিকে যাচ্ছে এবং শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল এবং হরমুজ প্রণালির ব্যাপক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দেশের জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতা কেবল একটি সরবরাহ সংকটের লক্ষণ নয়, এটি গভীরতর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রল পাম্পগুলোয় দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাচ্ছে না অথচ সরকারি বক্তব্যে বলা হচ্ছে- ‘জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই।’ এই দ্বৈত বাস্তবতা মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন সৃষ্টি করছে: যদি ঘাটতি না থাকে তাহলে এই দীর্ঘ লাইন কেন? কেন বোতলজাত তেলের অবৈধ বাজার গড়ে উঠছে? বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের নিবিড় সংযোগের কারণে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সংকট পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে যার প্রভাব বাংলাদেশও এড়াতে পারছে না।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডোর, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা যখন চরমে পৌঁছে তখন এই প্রণালির নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। ফলস্বরূপ তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় যা সরাসরি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বিপজ্জনক। বাংলাদেশ যেহেতু তার জ্বালানির একটি বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে তাই এই ধরনের বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়া স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় বাড়ে যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের রূপ নেয়। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে জ্বালানির গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবহন, শিল্প, কৃষি সবখানেই জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য। জ্বালানি সংকট দেখা দিলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ে যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে। একদিকে আয় বাড়ছে না অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে— এই দ্বৈত চাপে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে যা শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে একটি বৈশ্বিক সংকট কীভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।
উল্লেখ্য, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয় যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ। এই প্রণালিটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ২১ মাইল প্রশস্ত যার মধ্যে নৌ চলাচলের জন্য নির্ধারিত চ্যানেল আরও সংকীর্ণ। ফলে কোনো সামান্য সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনাও এখানে দ্রুত নৌ চলাচল ব্যাহত করতে পারে। ইরান বার বার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, যদি তার স্বার্থে আঘাত হানে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় তবে তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নৌবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে। মূলত এই দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতিই প্রণালিটিকে প্রায়ই সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায় যার ফল ভোগ করে বিশ্ববাসী। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শুধুমাত্র আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সৌর ও বায়ুশক্তি, দেশের জন্য একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। পাশাপাশি, জ্বালানি সংরক্ষণ ও দক্ষ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে, বাজার তদারকি জোরদার করা, অবৈধ তেল বিক্রি বন্ধ করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর দীর্ঘ মেয়াদে, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে একটি শক্তিশালী ও বহুমুখী জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে। কারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, এটি একটি দেশের সার্বভৌম উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ টেকসইয়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সর্বোপরি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা সংবেদনশীল এবং পারস্পরিক নির্ভরশীল। তাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সহযোগিতার মাধ্যমেই এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

