কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সে অবৈধ ৮৮ দোকান
  • বছরে ৬ কোটি টাকার ভাড়া ভাগ ভাটোয়ারা, বঞ্চিত ডিএসসিসি
  • ১ ও ২নং ভবনের মাঝখানে শ’খানেক অবৈধ দোকান, কোটি টাকা আয়
  • বাইক পার্কিংসহ পণ্য মজুদের জায়গা থেকেও আয় কোটি টাকা 
  • আ.লীগ আমলের বন্ধ করা দোকান খুলে নতুন করে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে 

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : দোকান সিটি করপোরেশনের, অথচ ভাড়ার টাকা পকেটে যায় প্রভাবশালী কমিটির—এমনই এক হরিলুটের মহোৎসব চলছে রাজধানীর কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সে। দীর্ঘ বছর ধরে লটারি বহির্ভূত ৮৮টি দোকান থেকে বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদলায়নি এখানকার চিত্র; বরং অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বারবার সিলগালা করা অবৈধ দোকানগুলো ফের চালু হয়ে যাচ্ছে, যা একদিকে যেমন সরকারের কোটি কোটি টাকা লোকসান করছে, অন্যদিকে চলার পথ দখল করে মার্কেটটিকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।

রাজধানীর গুলিস্তানে গড়ে ওঠা কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের ১নং ভবনে অবৈধ ৮৮টি দোকান থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কোনো ভাড়া না পাওয়ার তথ্য জানা গেছে। এসব দোকান বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১১ সাল থেকেই মার্কেট কমিটিরা ভাড়া তুলে নিজেদের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা করা হয় বলে ডিএসসিসির সূত্রে জানা গেছে। এসব দোকান থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও এ থেকে এক টাকাও ডিএসসিসি পাচ্ছে না। দোকানগুলো ডিএসসিসির লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ না হওয়ায় তা অবরাদ্দই থেকে গেছে। ফলে বছরের পর বছর যখন যে কমিটি মার্কেটের দায়িত্বে এসেছে তারাই কোটি কোটি টাকা ভাড়া আত্মসাৎ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিকভাবে দোকানগুলো থেকে কমিটি ভাড়া আদায় করে থাকে। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তাদের নেতাকর্মীরা কমিটি বানিয়ে অবরাদ্দ দোকানগুলো থেকে মাসে কোটি কোটি টাকা ভাড়া হাতিয়ে নেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে বন্ধ করে দেওয়া ৮৮টি অবরাদ্দ দোকান আবারও নতুন করে খুলে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।

ডিএসসিসির তথ্যমতে, বর্তমানে অবরাদ্দ দোকানের মধ্যে ১নং ভবনের নিচতলায় দোকান রয়েছে ৪৪টি এবং দ্বিতীয় তলায় ৪৪টি। এসব দোকান বিভিন্ন সময়ে ডিএসসিসির অভিযানে বন্ধ হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা আবার খুলে নতুন করে ভাড়া দেওয়া হয়। সূত্র জানিয়েছে, বিগত সময়ে কয়েক দফা (২০১৬-১৭ সাল) সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও সর্বশেষ ফজলে নূর তাপসের সময়ে (২০২৩ সাল) দোকানগুলো সিলগালা করা হলেও বিভিন্ন সময়ে কোর্টের আদেশ নিয়ে এসে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যোগসাজশে সেগুলো খোলাও হয়েছিল। তবে মাঝে সেগুলো বন্ধ থাকলেও সরেজমিন গিয়ে আবার খুলে ভাড়া দিতে দেখা গেছে। মার্কেটের বেশ কয়েকজন দোকান মালিক ও ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে দোকানের পজিশন অনুযায়ী এর ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। গলির সম্মুখে এবং গলির পেছনে কিংবা একটু আড়ালের জায়গায় হলে ভাড়া ওঠানামা করে থাকে।

বর্তমানে নীচতলায় ৩৫ হাজার থেকে ৫০/৫৫ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় তলায় ২০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দোকান ভাড়া চলছে। তবে ব্র্যান্ডের কোনো কোম্পানির দোকানের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম ভাড়ার তথ্যও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। এসব দোকানের নিচতলা এবং দ্বিতীয় তলায় সর্বনিম্ন ভাড়ার হিসাবসহ বাইক পার্কিং, দুই ভবনের মাঝখানে অবৈধ দোকান মিলিয়ে বছরে ৬ কোটিরও বেশি টাকা ভাড়া আদায়ের হিসাব পাওয়া গেছে। এই ভাড়া থেকে কোনোভাবেই ডিএসসিসি কোনো অর্থ পাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র উল্লেখ করেছে।

মার্কেটের বিভিন্ন দোকানদারের দেওয়া তথ্যমতে, নীচতলায় প্রতিটি দোকানে গড় ৪০ হাজার টাকা করে হলে মাসে ৪৪টি অবরাদ্দ দোকানের ভাড়া আদায় হয়ে থাকে ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যা বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে দ্বিতীয় তলায় কমপক্ষে ৩৫ হাজার টাকা করে হলেও মাসে ৪৪টি দোকানের ভাড়া দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যা ১২ মাসে হয় ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। নিচতলা এবং দ্বিতীয়তলা মিলিয়ে ভাড়া আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

অন্যদিকে দোকানের হিসাবের বাইরেও কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের ১ ও ২নং ভবনের মাঝখানে প্রায় শ’খানেক দোকানসহ পণ্য মজুদ করে রাখতে দেখা গেছে। এ ছাড়াও রয়েছে বাইক পার্কিংও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব অবৈধ দোকান, পার্কিং ও পণ্য রাখার জায়গা থেকেও মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ এবং বছরে দেড় কোটি টাকার ওপরে আয় হয়ে থাকে। আরও রয়েছে মার্কেটের প্রবেশমুখে ৮ থেকে ১০টি দোকান। যেগুলো থেকে দৈনিক হারে ভাড়া নেওয়া হয় বলে দোকানদাররা জানান। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। যার হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি। সব মিলিয়ে হিসাব করলে বছরে ৬ কোটি টাকারও বেশি ভাড়া মার্কেটটি থেকে আদায় হয়ে থাকে, যার কোনো অংশই ডিএসসিসি পাচ্ছে না।       

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মার্কেটটির সিঁড়ির নিচ থেকে শুরু করে হাঁটার পথ, ফাঁকা জায়গা— প্রায় সবখানেই দোকান বসানো হয়েছে। এতে পুরো মার্কেটের পরিবেশ অনেক ঘিঞ্জি দেখা যাচ্ছে। অনেক দোকানের সামনে আবার পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়, ফলে ক্রেতাদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি আগুন লাগাসহ যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও জরুরি নির্গমনের কোনো ব্যবস্থা মার্কেটটিতে দেখা যায়নি। কারণ জরুরি নির্গমনের জায়গাসহ সিঁড়ির প্রবেশমুখেও দোকান বসানো হয়েছে। এর সঙ্গে ১ ও ২নং ভবনের মাঝখানের জায়গা, হাঁটার পথ ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে অবৈধ দোকান ও বিভিন্ন কার্যালয় গড়ে তোলায় মার্কেটের পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।

কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের ১নং ভবনের বিক্রেতা রুবেল বলেন, ‘কমপ্লেক্স নির্মাণের সময় গুলিস্তান ও নবাবপুর রোডে এই দুটি ভবনের মাঝ বরাবর পৃথক দুটি প্রবেশপথ ছিল। আস্তে আস্তে এসব জায়গা অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন সরু গলি দিয়ে কমপ্লেক্সে চলাচল করতে হয়। কিন্তু মালামাল নিয়ে মার্কেটে চলাচল করতে অনেক সমস্যা হচ্ছে।’

ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘অবরাদ্দ দোকানগুলো মেয়র তাপসের আমলেও সর্বশেষ বন্ধ করা হয়েছিল। সেগুলো ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আস্তে আস্তে খোলা শুরু হয়। বর্তমান মার্কেট কমিটি সবগুলো দোকান খুলে তাদের মতো করে ভাড়া দিতে থাকে। 

এই কথার সত্যতা পাওয়া গেছে মার্কেটের এক দোকানদারের কথায়ও। তিনি নিজের নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে বন্ধ করা দোকান নতুন সরকার আসার পর একটা একটা করে খোলা হয়। যেটা ভাড়া হয়, সেটাই খোলা হয়েছে।’ আগের কমিটির কয়েকজন নতুন কমিটিতে আছে তারা মিলেই দোকানগুলো ভাড়া দেওয়ার কথা তিনি জানান। 

এদিকে ডিএসসিসির আইন বিভাগের তথ্য থেকে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখিত দোকানগুলো নিয়ে বেশ কয়েকটি রিট পিটিশন, রুল জারি, আপিল ও দেওয়ানি আপিল দায়ের করা হয়েছিল। যেগুলোর নম্বর হচ্ছে ১৪৪৩১/২০১৮, ৯৯৬৩/২০২১, ৩৮৬/২০২৩। এগুলো এখনও কোর্টে বিচারাধীন রয়েছে বলে ডিএসসিসির আইন বিভাগ সূত্রে জানা যায়।

প্রতিষ্ঠানটির আইন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘শুধু কাপ্তানবাজার নয়। ডিএসসিসির অনেকগুলো মার্কেটের দোকান নিয়ে হাজারখানেক মামলা চলমান রয়েছে। আমরা সব মামলাই আইনিভাবে মোকাবিলা করছি। আইনে যেভাবে সমাধান হয় সেভাবেই আগানো হচ্ছে।’

এদিকে কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সে বর্তমানে কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বিএম সাগর ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান (শ্যামল)। তাদের সঙ্গে বন্ধ থাকা দোকান খুলে ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে কথা বলার জন্য সরাসরি গেলেও কোনো কথা বলবে না বলে জানান এবং এসব বিষয়ে মার্কেট ইনচার্জ মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। বন্ধ থাকা দোকানগুলো খোলা হওয়ার কথা স্বীকার করে মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বন্ধ হওয়া ৮৬টির মতো দোকান খুলে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।’ যে কয়টি বাকি আছে সেগুলো খুব তাড়াতাড়ি ভাড়া হয়ে যাবে বলে তিনি জানান এবং কোর্ট থেকে আদেশ এনেই দোকানগুলো বাড়া দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।  

ডিএসসিসির রাজস্ব কর্মকর্তা (বাজার ও বিবিধ রাজস্ব) আতাহার আলী খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘অবরাদ্দ ৮৮টি দোকান থেকে ডিএসসিসি বর্তমানে কোনো ভাড়া পাচ্ছে না। এগুলো লটারির বাইরে ছিল। তবে অনেকবার ডিএসসিসি দোকানগুলোর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য লটারি করতে গিয়েও রিট পিটিশনের জন্য আইনিভাবে আটকে গিয়েছে। আগেও কয়েকবার দোকানগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল করপোরেশন। তবে সর্বশেষ আবারও দোকানগুলো খুলে ভাড়া দেওয়ার কথা জেনেছি।’ আইনিভাবে সামনে এর সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।  

দোকানগুলোর ভাড়ার বিষয়ে কথা বললে তিনি জাতীয় অর্থনীতির ভাড়ার পরিমাণের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, এখন ভাড়া মোটামুটি এমনই চলছে। তবে দোকান অনুযায়ী ভাড়া কম বেশি হতে পারে।

ডিএসসিসির সম্পদ বিভাগের সূত্রমতে, ১৯৮৫ থেকে ৮৬ সালের দিকে কাপ্তানবাজার কমপ্লেক্সের ১নং ভবনটি নির্মাণ করা হয়। মূল নকশায় নীচতলায় ৩৩০টি এবং দ্বিতীয় তলায় ৩২৯টি মিলিয়ে মোট দোকানসংখ্যা ছিল ৬৫৯টি। এখন থেকে সিটি করপোরেশনের অবরাদ্দ দোকানসংখ্যা রয়েছে ৮৮টি। ফলে ডিএসসিসি বর্তমানে ৫৭১টি দোকানের ভাড়া পেলেও বাকিগুলোর ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।