বাংলাদেশে সংস্কার এখন এক বহুল আলোচিত একটি শব্দ। নীতি-নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সংস্থা— সবাই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। কিন্তু এই সংস্কার কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেই প্রশ্নই থেকে যাচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মলনে আলোচিত বিষয়গুলো আবারও প্রমাণ করেছে— সংস্কার কাগজে যত সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির গভীর শিকড়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বল্পমেয়াদি চিন্তা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা সংস্কারের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, সংস্কার শুরু হলেও তা মাঝপথে থেমে যাওয়া বা বিপরীতমুখী হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিরল নয়।
যেকোনো দেশের টেকসই অগ্রগতির জন্য ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য। যদিও বাংলাদেশ একটি ক্রমবিকাশমান অর্থনীতি, কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বিচার বিভাগীয় ও সামাজিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার গ্রহণ করেছিল। ফলে বাজারমুখী অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। এর পর থেকে বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক স্বার্থপরতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতি-সংস্কারের প্রতি অপ্রতিশ্রুতিবদ্ধতা সংস্কার বাস্তবায়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে সংস্কার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্থবির হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
স্বৈরাচারী ব্যবস্থা অবসানের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা জরুরি। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর বাকি ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল বা রহিত, আর ১৬টি এখনই সংসদে পাসের জন্য বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। ওই অধ্যাদেশগুলো গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধন পাস করার বাধ্যবাধকতা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে পাস না হওয়ায় সেগুলোর কার্যকারিতা হারিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা যে ১৬টি অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস না হওয়ায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে তার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধ, গণভোটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রয়েছে। অন্যদিকে যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করেছে সরকার সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। অতীতে সরকারি দল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের দলীয়ভাবেই নিয়োগ দিত। এসব পরিবর্তনের জন্যই এই অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেগুলো অনুমোদন করছে না। সরকার সেগুলো রহিত করে দিয়েছে। অর্থাৎ বিচারপতি নিয়োগ অতীতের মতোই দলীয়ভাবেই হবে। ফলে বিচার বিভাগে চরম দলীয়করণ আবার ফিরে আসবে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সঙ্গে মানবাধিকার কমিশন, দুদক, গুম প্রতিরোধ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল মানুষের কল্যাণে। গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোর আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিধান করা হয়েছিল। এগুলো নতুন সরকারের অনুমোদন করা উচিত ছিল।
বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন, যা মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সংস্কার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার পেছনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা, কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রভাব ও সামাজিক চাহিদার দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে নীতি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তবে তা কাঠামোগত ও কার্যকর রূপ লাভ করতে পারেনি। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত প্রকৃতি সংস্কার বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন সংস্কারমুখী রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যারা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের স্বার্থে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে আগ্রহী। তবে কায়েমি স্বার্থবাদীরা প্রভাব বিস্তার করে সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে, ফলে সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সামাজিক ও নাগরিক চাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কারের ‘রোমান্টিক’ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা নাহলে সংস্কার কেবল নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন থেকে যাবে অধরাই। তাই সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।

