আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আগামী ১৪৪৭ হিজরির পবিত্র হজ মৌসুমকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লাখো মানুষের সফর নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ যাতায়াত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সৌদি আরব। দেশটির পরিবহন ও লজিস্টিক সেবা মন্ত্রণালয় আকাশ, সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথের সব ধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটি সুসমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় এনে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত আল্লাহর মেহমানদের ভোগান্তিহীন যাতায়াত নিশ্চিত করতে এবং মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে সংযোগ সহজতর করতেই এই বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
আকাশপথের পরিবহন ব্যবস্থায় এবার অভূতপূর্ব গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হজযাত্রীদের জন্য এবার আকাশপথে ৩১ লাখেরও বেশি আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক যাত্রী পরিবহনে ১২ হাজারেরও বেশি নিয়মিত এবং বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার চূড়ান্ত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা তদারকিতে সৌদি আরবের ছয়টি প্রধান বিমানবন্দরকে বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নিয়োজিত থাকবেন প্রায় ২২ হাজার অভিজ্ঞ কর্মী। এ বছর হাজিদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ‘ব্যাগেজ-মুক্ত ভ্রমণ’ সেবা চালু করা হয়েছে। এই পদ্ধতির ফলে যাত্রীদের মালামাল বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তাঁদের নির্ধারিত আবাসস্থলে পৌঁছে দেওয়া হবে, যা হজযাত্রীদের দীর্ঘ সময়ের ক্লান্তি ও বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেবে। এছাড়া জমজম কূপের পবিত্র পানি হজযাত্রীদের নিজ নিজ দেশে পাঠাতে আগেভাগেই শিপমেন্ট করার বিশেষ কারিগরি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা ‘সৌদিয়া’ একাই ১০ লাখের বেশি আসন নিশ্চিত করেছে এবং ‘ফ্লাইনাস’ বিশ্বের ২০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্য থেকে প্রায় দেড় লাখ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
পবিত্র নগরী মক্কা, মদিনা এবং মিনা-আরাফাত-মুজদালিফার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে দ্রুত যাতায়াতের জন্য সৌদির রেল ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ‘মাশায়ের ট্রেন’ সার্ভিস এবার মিনা, মুজদালিফা এবং আরাফাতের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি ট্রিপ সম্পন্ন করবে, যার মাধ্যমে প্রায় ২০ লাখ হাজি তাঁদের হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্যদিকে, মক্কা ও মদিনার মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে ‘হারামাইন হাই-স্পিড রেলওয়ে’ ৫ হাজার ৩০৮টি বিশেষ যাত্রার আয়োজন করেছে। অত্যাধুনিক এই রেল সেবার মাধ্যমে প্রায় ২২ লাখ যাত্রী অত্যন্ত অল্প সময়ে দুই পবিত্র নগরীর মধ্যে যাতায়াত করতে পারবেন।
সড়কপথের আধুনিকায়ন ও নিরাপত্তায় সৌদি কর্তৃপক্ষ এক বিশাল সংস্কার অভিযান পরিচালনা করেছে। মরু অঞ্চলের প্রতিকূলতা কাটিয়ে যাতায়াত সচল রাখতে রাস্তাগুলো থেকে প্রায় ৫৬ মিলিয়ন কিউবিক মিটারের বেশি বালুর স্তূপ সরিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। রাতে যাতায়াতের সুবিধার্থে সড়কগুলোতে ১ লাখ ৭৮ হাজার নতুন লাইটিং ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে এবং হাজিদের পথনির্দেশনার জন্য বসানো হয়েছে ৪ হাজারেরও বেশি আধুনিক সাইনবোর্ড। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ৩৩ হাজার উন্নত মানের বাস এবং ৫ হাজার ট্যাক্সির একটি বিশাল বহর সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আকাশ ও স্থলপথের পাশাপাশি জেদ্দা ইসলামিক পোর্টে সমুদ্রপথে আসা হাজিদের জন্য বিশেষ টার্মিনাল ও সেবা কেন্দ্র সচল করা হয়েছে।
পুরো হজ মৌসুমে যেকোনো ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট সেফটি সেন্টার’ একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করেছে। সেখান থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সব ধরণের যানবাহন ও যাতায়াত ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। যেকোনো সমস্যায় দ্রুত উদ্ধারের জন্য বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দল বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে মোতায়েন থাকবে। সৌদি সরকারের এই সমন্বিত এবং আধুনিক পরিকল্পনা বিশ্বজুড়ে হজযাত্রীদের মধ্যে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে, যা পবিত্র হজ পালনকে আরও সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ করবে।
জেএ/অভি


