- এক মাসে দুবার ঘোষণা ছাড়া উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর
- পর্ষদে প্রভাবশালীদের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতার কারণ
- ঝুঁকির মুখে বেশিরভাগ শেয়ারের মালিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা
‘ঘোষণা ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার লেনদেন বিএসইসি এবং ডিএসইর আইনের লঙ্ঘন। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালীরা আছেন। এ কারণেই হয়তো বিএসইসি নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ না করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
ড. তৌফিক আহaমদ চৌধুরী
সাবেক মহাপরিচালক
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)
আনিসুর রহমান, ঢাকা: পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের (এনবিএল) উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরে বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। আইন লঙ্ঘন করে একাধিকবার গোপনে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংক এই আইন লঙ্ঘন করেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুবার ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে কোনো ঘোষণা ছাড়াই। এত বড় অনিয়মের পরও ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও (ডিএসই) নির্বিকার ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালীরা থাকার কারণেই হয়তো বিএসইসি নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা না গেলে পুঁজিবাজারে সুশাসন অসম্ভব। এর তাৎক্ষণিক প্রভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এবং দীর্ঘ মেয়াদের দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
‘দ্য সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯’ ও ‘ডিএসই লিস্টিং রেগুলেশন, ২০১৫’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে অগ্রিম ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ডিএসইর বিধির ৩৪ ধারা (১) অনুযায়ী, উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ক্রয়, বিক্রয় বা হস্তান্তরের ইচ্ছা একসঙ্গে স্টক এক্সচেঞ্জ ও কমিশনকে নির্ধারিত ফরম্যাটে লিখিতভাবে জানাতে হবে। স্টক এক্সচেঞ্জ ওই উদ্যোক্তা পরিচালকদের ঘোষণাটি ট্রেডিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রচার করবে। এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট শেয়ারের সংখ্যা ৩২১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭০টি। এর মধ্যে ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, ক্ষুদ্র বা সাধারণ উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের হাতে ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং বিদেশিদের হাতে মাত্র দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার আছে। অর্থাৎ বেশিরভাগ শেয়ারের ধারক হিসেবে ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট শেয়ারের ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বা ৫০ কোটি ২৫ হাজার ৫৫৫টি শেয়ার উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের হাতে ছিল। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তা কমে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশে অর্থাৎ ৪৩ কোটি ১১ লাখ ২৩ হাজার ১২৮টি শেয়ারে নামে। অর্থাৎ ২ দশমিক ১৪ শতাংশ বা প্রায় ৬ কোটি ৮৯ লাখ ২ হাজার ৪২৭টি শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু বড় অঙ্কের এই শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ডিএসইতে আগে বা পরে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
কেবল একবারই নয়, উদ্যোক্তাদের শেয়ারধারণে আরও একবার কোনো ঘোষণা ছাড়াই পরিবর্তন আসে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ উদ্যোক্তাদের শেয়ার সংখ্যা বেড়ে ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক মাসের মাথায় ৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বা ১২ কোটি ৯১ লাখ ১১ হাজার ৫৫৬টি শেয়ার আবার উদ্যোক্তাদের হাতে চলে যায়। এবারও কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এত বড় অনিয়মের স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশ্লষকদের মত। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে বিএসইসি শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে না কি প্রভাবশালী মহলের চাপে এই অনিয়ম অব্যাহত থাকবে- সেই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষুদ্র লেনদেনও নথিভুক্ত থাকে, সেখানে বড় ব্যাংকের পরিচালকদের ঘোষণা ছাড়া শতকোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হওয়া পুঁজিবাজারের সুশাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘ঘোষণা ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার লেনদেন বিএসইসি এবং ডিএসইর আইনের লঙ্ঘন। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালীরা আছেন। এ কারণেই হয়তো বিএসইসি নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ না করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ব্যাংক দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং সুশাসনের ঘাটতির কারণে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। শেয়ারবাজারেও এর স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির শেয়ারের দর ১০ টাকার অভিহিত মূল্যের নিচে অবস্থান করছে। গতকাল সোমবার ডিএসইতে লেনদেন শেষে এর দর ছিল ৪ টাকা ৫০ পয়সা।
উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণা না দেওয়ার বিষয়ে জানতে ন্যাশনাল ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কায়সার রশিদকে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ডিএসইর চিফ রেগুলেটরি অফিসারের (সিআরও) দায়িত্বে থাকা শফিকুল ইসলাম ভুইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
এদিকে সম্প্রতি ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০ আগস্ট পুরোনো পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ৫৪১তম বোর্ড সভায় তাবিথ আউয়াল ও নাজনীন আহমেদকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তাবিথ আউয়াল দেশের প্রভাবশালী শিল্পপতি ও বর্তমান বিএনপির সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে। একই মন্ত্রিসভার আরেক সদস্যও এই ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ব্যাংকের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তাই বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর অবস্থান নেওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না।
সামান্য ত্রুটিতেই যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়- সেখানে বড় ব্যাংকের পরিচালকদের সুস্পষ্ট অনিয়মের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল বাজারের স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ন্যাশনাল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরে আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘এনবিএলের পরিচালকদের শেয়ার কেনাবেচার ব্যাপারে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্তসাপেক্ষে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে কমিশন।’

