- জমি অধিগ্রহণসহ প্রস্তুতিমূলক কাজ চলমান
- ২-৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় জাপানি কোম্পানি
- চীনের প্রস্তাব যাচাইয়ের জন্য পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো স্থলভাগে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সংকটের সময়ও দেশে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের মধ্য দিয়ে ‘বিল্ড–কনস্ট্রাক্ট–পার্টনারশিপ’ (বিসিপি) মডেলের আওতায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়। এরপর ৩ ডিসেম্বর প্রজেক্ট ডেলিভারি টিম গঠন হয়। বর্তমানে প্রকল্প অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠনের কাজ চলমান রয়েছে।
এই টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) কর্তৃক নির্ধারিত ৬৭ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অবস্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি এবং মোট ব্যয় সম্পর্কেও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। জমি অধিগ্রহণ ও কারিগরি– আর্থিক মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রকল্প ব্যয় ও অবস্থান নির্ধারণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
স্থলভিত্তিক এই টার্মিনাল নির্মাণে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে চীনের সিএনসিইসি ইন্টারন্যাশনাল ও জাপানের জেইআরএ সরকারের কাছে পৃথক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। জেইআরএ তাদের প্রস্তাবে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছে। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। বর্তমান সরকার (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব) পিপিপি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে চায় এবং ইতোমধ্যে চীনা প্রস্তাবটি পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিনিয়োগ সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এই বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন আর এসব বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’
এদিকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে ‘কুতুবজোম’ এলাকায় নতুন একটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এ কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সংশ্লিষ্ট কমিটি প্রতিবেদনটি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর পায়রা অঞ্চলেও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বিদ্যমান একটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার খাতে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেব্রুয়ারি শেষে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল জোটের হামলার পরপরই কাতারএনার্জি এলএনজি উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে। এতে বিশ্ববাজারে এলএনজি সংকট দেখা দেয়। বাংলাদেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আসে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে। ভূ-গর্ভস্থ গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৯০০ থেকে ৯৮০ এমএমসিএফটি এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয় পেট্রোবাংলা। গত ডিসেম্বরে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল ৯ দশমিক ৯৯ ডলার, সেখানে মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৭৬ থেকে ২৮ দশমিক ২৮ ডলারে। সব মিলে সংকটের এক মাসেই সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে সাতটি এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে। এ সময়ে জ্বালানি সাশ্রয়ে পাম্পে তেল বিক্রি ১০ শতাংশ কমিয়ে দেয় সরকার। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকা চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।

