নাদিরা ইসলাম: পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত। দেশের মোট আদিবাসীর বেশির ভাগের বসবাস এখানে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় সর্ববৃহৎ। সুপ্রাচীনকাল থেকেই চাকমারা সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অধিকারী। চাকমা লোকগানের চারটি ঐতিহ্যবাহী ধারা: গেংখুলী (পালা গান), বারমাচ (বারোমাসি গান), ওলিদাগনি (ঘুম পাড়ানি গান), উবো গীত (প্রেমের গান)। প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, ছড়া, বারোমাসি, শোকগাঁথা, প্রেমসংগীত, ভাবসংগীত, ইতিকথা, উপাখ্যান, ইত্যাদি উপাদানের সমন্বয়ে চাকমা লোকসাহিত্যের ভাণ্ডার প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে। বৈচিত্র্যের ব্যাপকতায় এবং জীবনের সঙ্গে একাত্মতার কারণে চাকমাদের এসব লোকসাহিত্য যুগ যুগ ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাদের লোকসাহিত্যের অন্তম অনুষঙ্গ লোকগানের মধ্যে রয়েছে গেংখুলী পালা গান, বারমাচ (বারোমাসি গান), উবোগীত (প্রেম সংগীত), ওলিদাগানি (ঘুম পাড়ানি) গান।
এ গানগুলোর সুর মানুকে আকৃষ্ট করে। লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় লোকগান জনমানুষকে আকৃষ্ট করে তার সুরের মহিমায়। সুরের কোনো সীমারেখা নেই। তাই চাকমা ভাষা সবার বোধগম্য না হলেও সুর ঠিক তার জায়গা করে নিয়েছে। নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্যের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে এ পালাগানগুলোতে। এ পালাগানগুলো চাকমা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। চাকমা সমাজে যারা এ গেংখুলী গীত রচনা ও পরিবেশন করেন তাদেরও গেংখুলী বলা হয়। গেংখুলীরা মূলত চারণ কবি। তাদের গাওয়া গীত-ই গেংখুলী গীত হিসেবে পরিচিত। এসব পালাগুলোতে চাকমা জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। চারণ কবিদের গীত এ পালাগুলোতে চাকমাদের বীরত্ব গাঁথা, সমাজ ব্যবস্থা, যুদ্ধ বিগ্রহ, ধর্মীয় রীতিনীতি, প্রেম-বিরহ একই সঙ্গে ঠাঁই পেয়েছে। চাকমা জনশ্রুতিতে আছে, উঠানে আসর করে এ গানের আয়োজন করা হতো। যিনি এ গান পরিবেশন করতেন, তার বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতা থাকত। মঞ্চে উপবিষ্ট সামনের সারির শ্রোতাদের ভবিষ্যতও তিনি বলে দিতে পারতেন। তাই নামকরণ করা হয়েছে গেংখুলী। অর্থাৎ দিব্যজ্ঞানসম্পন্ন চারণ কবি। যিনি জ্ঞান খুলে ভবিষ্যত বার্তা দিতে পারেন।
বারমাচ গান (বারোমাসি গান)
বারমাচ গান বা বারোমাসি গান মূলত ব্যথাতুর নারীর বারোমাসের দুঃখ-বিরহ গান। বারোমাসি গানের ভেতর দিয়ে একটি বিদগ্ধ যুবতীর হৃদয়ের হা-হুতাশ, ভাবাবেগ ও মিলনের আকাঙ্ক্ষা করুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। এখানে বারোমাস ও ঋতুর কালের আবর্তন, নারীর মনস্তত্ত্ব, প্রেমিকার বিরহ বিলাপ, শোকাতুর নারী হৃদয়ে প্রেমিককে ফিরে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার রেশ থাকে। বারোমাসি গানগুলো বিশেষ বিশেষ শিরোনামে বিভক্ত। এর অধিকাংশ শিরোনামগুলো বিরহিনী নারীর নামের সঙ্গে জড়িত। যেমন: বিন্না বারোমাসি, দুগলা বারোমাসি, ভেলুয়া বারমাসী।
মধ্যযুগের বারোমাসি সাহিত্যের ব্যতিক্রম আরেকটি বারোমাসির নাম হলো চাকমা সাহিত্যে বারোমাসি। চাকমা গীতিকায় (গেংখুলী গীত) চান্ধবীর বারোমাস্যা, কির্বাতীর বারোমাস্যা ও বাপ-মা বারোমাস্যা ইত্যাদি বারোমাসীর সন্ধান পাওয়া যায়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নারী হৃদয়ের বেদনাতুর বারোমাসের দুঃখের বর্ণনার পাশাপাশি ম-বাবাহীন শিশুর দুঃখ গাঁথাও ঠাঁই পেয়েছে চাকমা ‘বাব মা বারমাচ’ বারোমাসি সাহিত্যে। শিশুকালে যাদের মা-বাবা মারা যায়, তারা যে কত অবহেলা আর অনাদরে বড় হয়— তারই একটি নিদারুণ দৃশ্যপট অঙ্কন হয়েছে এই বারোমাসি গীতিকাটাতে।
চাকমা বারোমাসির বিশেষত্ব
সান্দবীর বারমাচ এ নারীর ব্যথাতুর হৃদয়ে পুনরায় সুখের দেখা মিলিছে অন্যদিকে, বাপ-মার বারোমাচে অনাথ শিশু হৃদয়ের কান্না এবং সামাজিক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে— যা বাংলা সাহিত্যে একেবারেই বিরল।
শুধু নায়িকা নয়; বরং যে কারও দুঃখবোধ থেকেই বারোমাসির রচনা হতে পারে।
চাকমা ওলিদাগানি গীত (ঘুম পাড়ানি গান)
শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য বিভিন্ন দেশে মায়েরা ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে থাকেন। যেমন- বাংলাদেশে- ঘুমপাড়ানি গান ‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো কিংবা ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি’ প্রভৃতি গান গাওয়া হয়। অন্যদিকে—
ভারত: ঘুম পাড়ানি গানে ‘চাঁদ মামা’ কে ডাকা হয়।
কেনিয়া: ‘হায়েনার ভয় দেখিয়ে’ ঘুম পাড়ানো হয়।
যুক্তরাজ্য: দোলনায় রেখে বিশেষ গানের তালে তালে শিশুদের ঘুম পাড়ায়।
ইরাক: ঘুম পাড়ানি গানে রয়েছে মরুভূমির বিষণ্ন সুর। হারানো স্বজনদের স্মরণে সেই গান গাওয়া হয়।
সুইডেন: প্রচলিত ঘুমপাড়ানি গান শিশুদের ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
অপরদিকে চাকমা ওলিদাগনি গীত বা ঘুম পাড়ানি গানে বাচ্চাকে কোনো ভয় ভীতি, বিষাদ বা করুণ কিছু শোনানো হয় না। বরং শিশুকে সাহসী করে তুলতে নানা রকম গান শোনানো হয়। অনেকটা এরকম ‘ইদুঁরে করছে খসখস / বিড়াল আছে বসে / মোদের খোকনকে ডাক দাও / বিড়াল মারুক গে। তবে সাধারণত চাকমা নারীরা যখন কাজে ব্যস্ত থাকে তখন বাচ্চার দাদা-দাদি ওলিদাগানি গীতে এরকম সাহসী বক্তব্য সম্পৃক্ত ওদিদাগানি গীত গেয়ে থাকেন
উবো গীত চাকমা সম্প্রদায়ের মৌখিক প্রেমের গান। যুগ পর যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ধারাকে লালন ও চর্চা করে এসেছে। এ গানের মূল বিষয়বস্তু প্রেম। এ প্রেম একেবারেই লৌকিক। চাকমাদের জনজীবনের ছোট থেকে বেড়ে উঠা কিশোর-কিশোরীর প্রথম আবেগের গান এটি। চাকমা সংস্কৃতিতে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে নানা রকম লোকখেলায় মত্ত থাকে যেমন- নাদেং খেলা, ঘিলা খেলা, বর্গী ধরা খেলা ইত্যাদি। কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণকালে তাদের মধ্যে প্রণয়ের সঞ্চার হয়। সাধারণত তখন এ গানগুলো তারা গায়। যেহেতু লৌকিক প্রেমের চাকমা লোকসংস্কৃতির গান তাই এর বাণী, ভাষাও কিছুটা চটুল। এ গানের শুরু ঠিক কবে হয়েছে বলা খুবই দুরূহ বিষয়। তবে একজন চাকমা রমণী এক প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘আমরা ছোট বেলা থেকেই এসব গান শুনে আয়ত্ত করেছি এবং এখনও গাই। বিশেষ করে আগে মোবাইল কিংবা যোগাযোগের তেমন কোনো মাধ্যম ছিল না। তখন পাহাড়ে চাকমা রাখাল যখন গরু চরাতো আর জুম চাষে মত্ত থাকত তখন সে এই উবোগীত গেয়ে তার প্রেমিকাকে ডাকত। সেই থেকেই এই গানের প্রচলন। চাকমা যেকোনো অনুষ্ঠানে এই উবোগীত থাকেই। প্রেম-নির্ভর এ গানটিতে চাকমা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুটে উঠে।
এসব গান যথাযথ চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে আজ বিলুপ্তপ্রায়। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও চাকমা জনগণের সদিচ্ছাই ঐতিহ্যবাহী এ গানের ধারাগুলোকে আজীবন জাগিয়ে রাখতে পারে।
সহকারী অধ্যাপক, সংগীত বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]

