পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় বিএসইসি উদ্যোগী হোক

দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই আস্থাহীনতা, অনিয়ম ও দুর্বল তদারকির অভিযোগে জর্জরিত। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ এখনও মনে করেন, বাজারে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না, প্রভাবশালীদের জন্য এক নিয়ম আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেক নিয়ম চলে। 

সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের (এনবিএল) উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তরে বড় অনিয়ম দেখা দিয়েছে। আইন লঙ্ঘন করে একাধিকবার গোপনে ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর করেছে। আইন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে ঘোষণা দিতে হয়, কিন্তু ন্যাশনাল ব্যাংক এ আইন লঙ্ঘন করেছে। 

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত অন্তত দুবার ব্যাংকটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে কোনো ঘোষণা ছাড়াই। এত বড় অনিয়মের পরও ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পাশাপাশি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জও (ডিএসই) নির্বিকার ভূমিকা পালন করেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালীরা থাকার কারণেই হয়তো বিএসইসি নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ করা না গেলে পুঁজিবাজারে সুশাসন অসম্ভব। এর তাৎক্ষণিক প্রভাবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ও দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট শেয়ারের সংখ্যা ৩২১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৭০টি। এর মধ্যে ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে সর্বোচ্চ ৪৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৬ দশমিক ৬১ শতাংশ, ক্ষুদ্র বা সাধারণ উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের হাতে ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং বিদেশিদের হাতে মাত্র দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার আছে। অর্থাৎ বেশিরভাগ শেয়ারের ধারক হিসেবে ক্ষুদ্র বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

উদ্যোক্তাদের শেয়ারধারণে আরও একবার কোনো ঘোষণা ছাড়াই পরিবর্তন আসে। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ উদ্যোক্তাদের শেয়ারসংখ্যা বেড়ে ১৭ দশমিক ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ এক মাসের মাথায় ৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ বা ১২ কোটি ৯১ লাখ ১১ হাজার ৫৫৬টি শেয়ার আবার উদ্যোক্তাদের হাতে চলে যায়। এবারও কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। 

এত বড় অনিয়মের স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে বিশ্লষকদের মত। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে বিএসইসি শেয়ারবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে না কি প্রভাবশালী মহলের চাপে এই অনিয়ম অব্যাহত থাকবে— সেই প্রশ্ন তুলেছেন তারা। যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষুদ্র লেনদেনও নথিভুক্ত থাকে, সেখানে বড় ব্যাংকের পরিচালকদের ঘোষণা ছাড়া শত কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হওয়া পুঁজিবাজারের সুশাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘোষণা ছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার লেনদেন বিএসইসি ও ডিএসইর আইনের লঙ্ঘন। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রভাবশালীরা আছেন। এ কারণেই হয়তো বিএসইসি নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে। প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ না করা গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সামান্য ত্রুটিতেই যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়— সেখানে বড় ব্যাংকের পরিচালকদের সুস্পষ্ট অনিয়মের পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা ‘দ্বৈত মানদণ্ডের’ ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল বাজারের স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

শেয়ারবাজার এখন দ্বিমুখী সংকটের মুখে। একদিকে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয়; অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগকারীও খুব বেশি আসছেন না। তাই বাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু রাতারাতি ও এককভাবে কারও পক্ষে বাজার থেকে সব অনিয়ম দূর করা কঠিন কাজ। এই কঠিন কাজই করতে হবে বাজার–সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে, ধীরে ধীরে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। এই অবস্থার পরিবর্তন তথা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাস্তবমুখী নীতি ও পরিকল্পনা নিতে হবে।