পরিবার হলো সমাজের মূল কাঠামো। একটি সুস্থ, সুখী ও আল্লাহমুখী পরিবার গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের ওপর। ইসলাম কেবল ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান— যেখানে পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিটি স্তরে শ্রদ্ধার নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে।
কোরআনের দৃষ্টিতে পারিবারিক বন্ধন
আল্লাহ তায়ালা কোরআনে পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে মওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) ও রহমাহ (দয়া)-এর কথা উল্লেখ করেছেন- ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জুটি সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও, এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আর-রূম, ২১)
এই আয়াত কেবল স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো পারিবারিক পরিবেশের একটি মূলনীতি— যেখানে শ্রদ্ধা থাকবে, সম্মান থাকবে, আর একে অপরের প্রতি কোমলতা থাকবে।
মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা: সর্বোচ্চ দায়িত্ব
ইসলামে আল্লাহর ইবাদতের পরেই মা-বাবার প্রতি সদাচারণের কথা বলা হয়েছে— এটি কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশ নয়, এটি বিশ্বাসের অংশ।
‘তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মা-বাবার প্রতি সদাচার করতে। তারা একজন বা উভয়ই বার্ধক্যে পৌঁছালে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না। (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭: ২৩)
একটি মাত্র শব্দ ‘উফ’— নিষেধ করা হয়েছে। কারণ শ্রদ্ধার বিষয়টি কেবল বড় আচরণে নয়, সূক্ষ্ম কথায়, ভাষায় ও ভঙ্গিতেও প্রকাশ পায়।
এ ব্যাপারে নবীজির (সা.) দিকনির্দেশনাও স্পষ্ট। তিনি এরশাদ করেন: ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমি নবীজিকে (সা.) জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়?’ তিনি বললেন, ‘সময়মতো নামাজ আদায় করা।’ আমি বললাম, ‘তারপর কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার।’ আমি বললাম, ‘তারপর কোনটি?” তিনি বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদ।’ (সহিহ বোখারি ও মুসলিম)
নবীজির (সা.) পারিবারিক আদর্শ
রাসুলুল্লাহ (সা.) পারিবারিক শ্রদ্ধার জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (সুনান আত-তিরমিজি)
নবীজি (সা.) ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং সন্তানদের সঙ্গে খেলতেন। শ্রদ্ধা কেবল কথায় নয়, কাজেও প্রমাণিত হয়।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) ঘরের কাজে নিজ পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করতেন; আর যখন নামাজের সময় হতো, তখন তিনি নামাজে চলে যেতেন।’ (সহিহ বোখারি)
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে ঘরোয়া বিষয়ের বাইরে স্ত্রীদের তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বাস্তবতা হয়তো আরও খারাপ: তাতেও সন্দেহ রয়েছে! কিন্তু আমরা দেখেছি, যুদ্ধ এবং সন্ধির মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও প্রয়োজনে তিনি স্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন।
হুদাইবার চুক্তি ছিল একটি যুগান্তকারী চুক্তি যার কল্যাণে ইসলাম অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু এর সুচনা ছিল খুবই নাজুক। স্বভাবতই নবীজির যেই দূরদর্শিতা ছিল তা সাহাবাদের মধ্যে ছিল না। তাই তিনি চুক্তির যে সব প্রস্তাব মেনে নেন, তা অনেক সাহবার মনঃপুত হয়নি। এ সময়, সাহাবিরা কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হলে নবীজি (সা.) তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামার (রা.)-এর সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি পরামর্শ দেন— ‘আপনি নিজেই কোরবানি করুন ও মাথা মুণ্ডন করুন; তখন সাহাবিরা আপনাকে অনুসরণ করবে। নবীজি (সা.) তাই করলে সাহাবিরাও তা অনুসরণ করেন।’
শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়ার পথ
পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি গড়তে হলে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তিনটি বিষয়ে সচেতন হতে হবে: প্রথমত, ভাষার শুদ্ধতা— কঠিন বা অবমাননাকর শব্দ এড়ানো; দ্বিতীয়ত, উপস্থিতির মূল্য দেওয়া— একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা; তৃতীয়ত, পার্থক্যকে সম্মান করা— বয়স, মতামত বা ব্যক্তিত্বের ভিন্নতাকে বোঝার চেষ্টা করা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরিবারকে এমন পরিবেশ দিন, যেখানে প্রতিটি সদস্য নিরাপদ, সম্মানিত ও ভালোবাসায় আবৃত। কারণ একটি শ্রদ্ধাশীল পরিবারই একটি সুস্থ উম্মাহর সূচনাবিন্দু।
শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

