কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়াঞ্চল
- ৬ মাস পানিতে ডুবে থাকে হাওড়, নৌকাই একমাত্র ভরসা
- প্রতি নৌকার দাম ১ থেকে ১০ লাখ টাকা
- নিকলীতে বছরে কোটি টাকার নৌকা বিক্রি
- হাজারো কারিগরের কর্মসংস্থান এই শিল্পে
- প্রতিদিন ৬০০–৮০০ টাকা আয় কারিগরদের
- বংশ পরম্পরায় টিকে আছে নৌকা তৈরির ঐতিহ্য
আশরাফুল ইসলাম তুষার, কিশোরগঞ্জ: বর্ষাকালের আগমনে হাওড়াঞ্চলে বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের নিকলী-ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম এলাকায় পুরোদমে চলছে নৌকা তৈরির কাজ। যাতায়াত ও পর্যটনের জন্য তৈরি হচ্ছে সারি সারি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে কোটি টাকার বেশি অবদান রাখছে। বর্তমানে হাওড়াঞ্চলের প্রবেশ পথ নিকলী উপজেলার নৌকা তৈরির কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন, তবে কাঠের দাম বাড়ায় এবার নৌকা তৈরির খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছে মহাজনরা।
বছরের ৬ মাস জলমগ্ন থাকে কিশোরগঞ্জের হাওড় এলাকা। ফলে হাওড়পাড়ের প্রায় ১০ লাখ মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন নৌকা। বর্তমানে নৌকা তৈরি করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। হাওরাঞ্চলের নিকলী উপজেলায় তৈরি নৌকার জন্য বিখ্যাত হিসেবে সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছে। বছরে প্রায় কোটি টাকার নৌকা বিক্রি করেন তারা।
হাওড়পাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবন হাওড়, নদী-নালা খালবিল দ্বারা প্রভাবিত। এই অঞ্চলের মানুষের চিন্তা-চেতনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য, কৃষি সবকিছু হাওড়কেন্দ্রিক। তাই এসব ক্ষেত্রে হাওড় এলাকার সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার ভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কিশোরগঞ্জের হাওড় এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। তখন এই অঞ্চলের মানুষের চলাচলের ভরসা হয় ছোট-বড় বাহারি রকমের নৌকা। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই নৌকা দিয়ে হাওড়াঞ্চলে মানুষ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করার পাশাপাশি চলাচলের জন্যও এই বাহনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি হাওড়াঞ্চলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে ইঞ্জিনচালিত নৌকার জুড়ি নেই। জলমগ্ন ছয় মাস পর্যটক বহন করে কোটি টাকা আয় করছে এ অঞ্চলের নৌকার মালিক ও মহাজনরা।
তথ্যমতে, জেলা শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে হাওড়ের প্রবেশপথ নিকলী উপজেলায় যুগ যুগ ধরে তৈরি হচ্ছে কাঠের নৌকা। গ্রামের প্রায় কয়েক হাজারেরও বেশি মানুষের প্রধান পেশা নৌকা তৈরি করা ও নদীতে মাছ ধরা। প্রতিদিন ভোরে হাতুড়ির ঠক ঠক শব্দে ঘুম ভাঙে এ গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধদের। সূর্য ওঠার আগেই কারিগররা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নৌকা তৈরির কাজে। বছরের ১২ মাসই থাকে নৌকার কারিগরদের ব্যস্ততা। এমনকি এই নৌকাগুলো দিয়ে চলাচলের পাশাপাশি পর্যটকদের বিনোদন ও বিভিন্ন বালু কিংবা পাথর মহলে কাজ করে জীবিকার জোগান দেন হাওড় উপজেলার মানুষ।
নিকলী উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল মিয়াসহ অন্যরা জানান, নৌকা তৈরি করা তাদের পূর্বপুরুষদের কাজ। তারাও বংশ পরম্পরায় এ কাজ করে আসছেন। কিন্তু বর্তমানে সুষ্ঠু বিনিয়োগের অভাবে এ ব্যবসায় লাভবান হতে পারছেন না তারা। নৌকা তৈরির মহাজন ইসলাম উদ্দিন জানান, যে বছর বৃষ্টি বেশি হয় এবং এলাকায় পানি বেশি ওঠে, সে বছর নৌকা বেশি বিক্রি হয়। প্রতিটি নৌকা আকার ও কাঠের প্রকারভেদে এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তাদের দাবি, তাদের তৈরিকৃত নৌকা অন্য এলাকার নৌকার চেয়ে দামে সস্তা এবং মজবুত। তাই আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এসে নৌকা কিনে নিয়ে যান।
নৌকা তৈরির কারিগর মনির মিয়া জানান, একেকজন কারিগর প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ করেন। প্রতিটি নৌকা তৈরিতে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পান তারা। প্রতি মৌসুমে একেকজন ৮ থেকে ১০ টি ছোট-বড় নৌকা তৈরির কাজ করতে পারেন।
নৌকা তৈরির মহাজন মিয়া হোসেন বলেন, বর্ষায় নদীতে মাছ ধরা, পর্যটকদের ভ্রমণ ও নানা কাজে নৌকার বিকল্প নেই। পর্যটকদের বিনোদনের জন্য ৬ মাস নৌকার ব্যবসা ভালো হয়। তাই এ অঞ্চলের মানুষ নৌকা তৈরি করে বিভিন্নভাবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, হাওড় উপজেলা নিকলীতে বর্ষাকালে ছয়মাস প্রচুর পর্যটক ঘুরতে আসেন। তারা নৌকা ভ্রমণের মাধ্যমে হাওড়ের প্রকৃতি উপভোগ করে থাকেন। পর্যটকদের জন্য উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

