- স্বর্ণের গহনায় ভরিতে ২ হাজার টাকা প্রস্তাব
- হীরার গহনায় ক্যারেটে ২ হাজার টাকা প্রস্তাব
- স্বর্ণের ভরিতে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ টাকা রাজস্ব কমবে
- হীরার ক্যারেটে কমবে প্রায় ৩ হাজার টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জুয়েলারি দোকানের বিক্রিতে এখন ৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট দিতে হয়। কিন্তু দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। ফলে সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় সম্ভব হচ্ছে না। তাই জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন বাড়ানোর কথা ভাবছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এমন প্রেক্ষাপটে বিক্রয়মূল্যের বদলে ওজনের ভিত্তিতে ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।
আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রতি ভরি স্বর্ণের গয়না এবং প্রতি ক্যারেট হীরার গয়নায় ২ হাজার টাকা করে ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাব করে সংগঠনটি। অথচ বর্তমান ভ্যাট হার অনুযায়ী, এক ভরি স্বর্ণ বিক্রিতে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট দিতে হয়। বিপরীতে মাত্র ২ হাজার টাকা ভরিপ্রতি ভ্যাট দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বাজুস। এতে ভরিপ্রতি অন্তত ১০ হাজার টাকা করে রাজস্ব হারাবে সরকার। অন্যদিকে প্রতি ক্যারেট হীরায় এখন ভ্যাট আসে প্রায় ৫ হাজার টাকা। সেখানে প্রায় ৩ হাজার টাকা রাজস্ব হারাবে সরকার।
জুয়েলারি দোকানগুলোর ৯৫ শতাংশই ভ্যাট দেয় না। প্রতিবছর এই খাত থেকে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায় সম্ভব। কিন্তু সেখানে মাত্র ১৩৮ কোটি টাকার ভ্যাট আদায় হয়। এর মধ্যে ওজনের ওপর ভ্যাট নির্ধারণ করলে এই খাত থেকে আরও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় কমে যাবে। এর ফলে এই খাতে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হবে এবং সরকার বিপুল পরিমাণের রাজস্ব হারাতে পারে।
প্রস্তাবের পক্ষে বাজুসের যুক্তি, যখন ৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম বা ভরিপ্রতি ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ৮০ হাজার টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। স্বর্ণের দাম বাড়লেও গহনা তৈরির মজুরি বা মূল্য সংযোজন আনুপাতিক হারে বাড়েনি। অথচ ভ্যাটের পরিমাণ টাকার অংকে প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। এই উচ্চহারের কারণে ক্রেতারা ভ্যাট প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন, যা রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলছেন, বাজুসের নিবন্ধিত সদস্যরাও সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় না। সঠিকভাবে ভ্যাট দিলে মাসে ১৫ কোটি টাকা নয়, ৩৭ কোটি টাকা আদায় হতো। স্বর্ণ কিনতে গেলে দোকান থেকে ক্রেতাকে বলা হয়, ভ্যাট লাগবে না। ভ্যাট ছাড়া স্বর্ণ কেনা যায়। সেজন্য ক্রেতারা ভ্যাট দিতে উৎসাহ বোধ করেন না।
বাজুস বাজেটে চারটি প্রস্তাব পেশ করে। প্রস্তাবে পণ্যের মূল্যর সাথে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করা, খুচরা পর্যায়ে পণ্য কেনার সময় প্রযোজ্য ভ্যাট প্রত্যাহার, প্রচলিত ভ্যাট ফরম পরিবর্তনের দাবি করে। জুসের তথ্যমতে, রাজধানীর অভিজাত এলাকাসহ ৩২টি অঞ্চলে অন্তত ২ হাজার ১৬৯টি জুয়েলারি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। অনিবন্ধিত দোকানগুলো ভ্যাট ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা হলেও তা রাজস্ব খাতে জমা হবে না। অনিবন্ধিত থাকায় টাকা আদায়েরও সুযোগ পাবে না এনবিআর।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক দোলন বলেন, ‘এই খাতে ৯৫-৯৮ শতাংশ ভ্যাট দেয় না। তাও আমরা সরকারকে ১৩৮ কোটি টাকা ভ্যাট দিয়েছি। যেহেতু ভ্যাট দেয় না, তাহলে আমরা কোথা থেকে দিয়েছি? আমরা সরকারের চাপে দিতে বাধ্য হয়েছি। আমাদের ধারণা, ফিক্সড ভ্যাট নির্ধারণ করলে ছয়গুণ ভ্যাট আদায় বৃদ্ধি পাবে। কারণ এখন কেউ ভ্যাট দিতে চায় না। এক ভরি স্বর্ণ কিনতে গেলে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হয়। এটা আমাদের দেশে কেউ দেয় না, ভবিষ্যতেও দেবে না। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা। আমরা সরকারকে ভ্যাট দিতে চাই।’
পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘বাজুসের দাবিটি অযৌক্তিক। এর মাধ্যমে সরকার রাজস্ব হারাবে। রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের রাজস্ব নীতির বিপরীত এটা। সরকার চাচ্ছে রাজস্ব আয় বাড়াতে। কিন্তু এখানে তারা বিপরীত দাবি করেছে।’

