বদিউল আলম মজুমদার: সরকারকে গণভোট কার্যকর ও বাস্তবায়ন করা উচিত। আমাদের সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি। অর্থাৎ জনগণের মতামতের প্রতিফলন। একইভাবে গণভোটও সংবিধানের মতোই জনগণের মতামতের প্রতিফলন। তাই গণভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই মত দিচ্ছেন গণভোট আমাদের সংবিধানে নেই। সংবিধান কি? সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন। তেমনি গণভোটও জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন। তাই এটা কোনো অংশে সংবিধান থেকে কম নয়। তাই গণভোটের রায় সবার মানা উচিত। গণভোটের বিষয়টি কিভাবে এসেছে? এর প্রেক্ষাপট রয়েছে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তিনটা সুস্পষ্ট আকাঙ্ক্ষা মানুষ ব্যক্ত করেছেন। প্রথমত, এই গণ-অভ্যুত্থানের আগে যারা অন্যায় করেছে, যারা খুন-খারাবি করেছে, যারা অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছেন তাদের বিচারের আওতায় আনা। দ্বিতীয়ত, কতগুলো মৌলিক সংস্কার করা, কতগুলো কাঠামোগত সংস্কার করা, কতগুলো আইনি সংস্কার করা, কতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা, যাতে সরকারি ব্যবস্থায় অন্যায়-অবিচার ও স্বৈরাচারী কাঠামো ফিরে না আসতে পারে। তৃতীয়ত, নির্বাচন।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে যাতে গণতান্ত্রিক সরকার ফিরে আসে, সেজন্য বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ করেছে। তিনটি আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। ১১টা সংস্কার কমিশনের মধ্যে প্রথম যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তার মধ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন অন্যতম। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কমিশন ছিল সংবিধান সংস্কার কমিশন।
পরে প্রথম ছয়টা সংস্কার কমিশনের প্রধানকে নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। পরবর্তীকালে এ ঐকমত্য কমিশন প্রথম ছয়টা সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছিল, তার মধ্য থেকে ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে স্প্রেড সিট তৈরি করেন। এর পর সেটি ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হয়েছে। এর পর ১৬৬টি সুপারিশের মধ্যে কোনটির সঙ্গে একমত এবং সেগুলো কিভাবে বাস্তবায়িত হবে— সেই প্রশ্নটি রাজনৈতিক দলগুলোকে করেছে ঐকমত্য কমিশন। ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল তাদের লিখিত মতামত দিয়েছে। এর পর কমিশন প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্তত একদিন বসেছে এবং বিএনপির সঙ্গে তিনদিন বসেছে ও ছাত্রদের সঙ্গে দুই দিন বসেছে। একইভাবে দ্বিতীয় দফায় আমরা আলোচনা করেছি। সুপারিশগুলোর ওপর কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সামনাসামনি আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় দফায় কমিশন সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একত্রে বসেছে। সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে কমিশন। ঐকমত্যের ভিত্তি হলো অধিকাংশ অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশ রাজনৈতিক দল একমত হওয়া এবং একইসঙ্গে বড় দলগুলোর অধিকাংশ দল একমত হওয়া। এই শর্ত যেখানে পূরণ হয়েছে সেগুলোকে ঐকমত্য বলা হয়েছে।
৮৪টি সুপারিশের মধ্যে ৩৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আইন করে কিংবা নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন করা যায়। বাকিগুলো অর্থাৎ ৪৮টি সংবিধান সংক্রান্ত। এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে। যেহেতু ৪৮টি সুপারিশকে চারটি ভাগ করা হয়েছে ও গণভোটের মাধ্যমে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তারা এসব সংস্কারের বিষয়ে একমত কিনা। এ গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রপতি জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ জারি করেছেন। এর ভিত্তিতেই গণভোট হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, এই আদেশের বিষয়টি আমাদের সংবিধানে নেই, যেটা গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানে না থাকলেও যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তখন জনগণকে দুটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছে। প্রথমত, জনগণ সংবিধান সংস্কার আদেশটি অনুমোদন করে কি না। দ্বিতীয়ত, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয়ে একমত কি না। এই দুটি বিষয়ে জনগণ ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে সম্মতি দিয়েছে। তাই এ দুটোই বৈধ। কারণ এটা সংবিধানের মতোই বৈধ। সংবিধান যেমন জনগণের মতামত, গণভোটও জনগণের সরাসরি মতামত।
গণভোটে জনগণ সম্মতি দিয়েছে, যারা নির্বাচিত হবেন তারা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, পাশাপাশি তারা ১৮০ কর্মদিবসের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। কিন্তু বিরোধী দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। শপথ না নেওয়াটা সঠিক নয়। শপথ নেওয়ার জন্য জনগণ সম্মতি দিয়েছে ও এটা অবশ্যই করণীয়। সংস্কারের ব্যাপারে যে দলগুলো ঐকমত্যে জড়িত ছিল, তাদের একটি অংশ তা বাস্তবায়ন না করে দূরে সরে এসেছে।
এখন গণভোটের ৪৮টি সুপারিশ সংবিধান সংস্কার করে সেগুলো ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে সংবিধানে ঢুকানো দরকার। দ্বিতীয়ত, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা অবসানের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা জরুরি। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে জাতীয় সংসদে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। বাকি ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর বাকি ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে চারটি বাতিল বা রহিত, আর ১৬টি এখনই সংসদে পাসের জন্য বিল আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। ওই অধ্যাদেশগুলো গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধন পাস করার বাধ্যবাধকতা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ের মধ্যে পাস না হলে সেগুলোর আর কার্যকারিতা থাকবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা যে ১৬টি অধ্যাদেশ আইন আকারে পাস না হওয়ায় কার্যকারিতা হারাচ্ছে তার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধ, গণভোটসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রয়েছে। অন্যদিকে যে চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করেছে সরকার সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় গঠনের বিষয়গুলো রয়েছে। অথচ এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। অতীতে সরকারি দল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের দলীয়ভাবেই নিয়োগ দিত। এসব পরিবর্তনের জন্যই এই অধ্যাদেশগুলো জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার সেগুলো অনুমোদন করছে না। সরকার সেগুলো রহিত করে দিয়েছে। অর্থাৎ বিচারপতি নিয়োগ অতীতের মতো দলীয়ভাবেই হবে। ফলে বিচার বিভাগে চরম দলীয়করণ আবার ফিরে আসবে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একইসঙ্গে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গুম প্রতিরোধ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল মানুষের কল্যাণে। গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোর আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিধান করা হয়েছিল। এগুলো নতুন সরকার অনুমোদন করছে না। এ ধরনের অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন না করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের কল্যাণেই এ অধ্যাদেশগুলো সরকারকে আইনে পরিণত করা উচিত। একইসঙ্গে তারা আরও কয়েকটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করছে, সেগুলোয় স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ হবে। কিন্তু বিএনপি তাদের ৩১ দফায় ও নির্বাচনি ইশতেহারে সুস্পষ্টভাবে বলেছে, তারা প্রশাসন নিয়োগ করবে না। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা যখন পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং যাদের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছিল তখন প্রশাসক নিয়োগের অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু এখন এই আইনগুলো অনুমোদনের মাধ্যমে তাদের হাতে ক্ষমতা থাকবে। ফলে এর অপব্যবহার হতে পারে। এ আইনের ফলে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে বসানোর সুযোগ পাবেন। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের লক্ষ্যে ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের রক্তের ঋণ পরিশোধের জন্য জনগণ যে জুলাই সনদ অনুমোদন করেছে সেটি ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা উচিত। দ্বিতীয়ত, যে অধ্যাদেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও যে অধ্যাদেশগুলোর মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে, গুমের সংস্কৃতির অবসান হবে, দলীয়ভাবে বিচারপতি নিয়োগের পুরোনো সংস্কৃতির অবসান হবে ও মানবাধিকার সুরক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে-সেগুলো অনুমোদন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো অনুমোদন হলেই অতীতের সৈরাচারী ব্যবস্থা আবার ফিরে আসার সুযোগ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে।
সম্পাদক,সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান
[প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, অনুবাদ, প্রতিক্রিয়া ও চিঠিপত্রে প্রকাশিত মতামত, উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের যথার্থতা ও মতামতের দায়িত্ব লেখকের নিজস্ব। এগুলোর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতির সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সর্বদা মিল না-ও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখার বিষয়ে জাতীয় অর্থনীতি কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ]

