হাবশার মানুষের মুখে মুখে যা রটেছিল উসমান (রা.) কে নিয়ে

ইতিহাসের গভীরে তাকালে কিছু মানুষকে দেখা যায়, যাদের জীবন এতটাই উজ্জ্বল যে যুগ যুগ ধরে তারা মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যায়। তেমনি এক মহান পুরুষ হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)। যে মানুষটি শুধু ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন না, বরং তাঁর দান, ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। ছোটবেলা থেকেই আমরা সাহাবিদের নাম শুনে আসছি, কিন্তু উসমান (রা.)-এর জীবনটা ছিল এক বিশেষ মিশেল। একদিকে কোমল হৃদয় ও লজ্জাশীলতা, অন্যদিকে অসীম সাহস ও ত্যাগের মানসিকতা। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তিনি জানতেন এ পথ মসৃণ নয়। অত্যাচার, নির্যাতন, দেশ ছাড়া সবকিছুরই মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কিন্তু একবার আল্লাহর পথে পা বাড়ানোর পর আর পিছনে ফিরে তাকাননি।

আজকের দিনে যখন আমরা নিজেদের স্বার্থ আর আরামের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত, উসমান (রা.)-এর তাবুক যুদ্ধে এক হাজার দিনার দানের ঘটনা আমাদের প্রশ্ন করে বসে আমরা কি কখনো নিজের সর্বস্ব আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতে পারি? যখন কোনো কাজে এগিয়ে যেতে দ্বিধা করি, তখন হুদাইবিয়ার ঘটনা মনে পড়ে যায় যেখানে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে রাসুলের (সা.) বাণী পৌঁছে দিতে মক্কায় গিয়েছিলেন।

আজকে আমরা উসমান (রা.)-এর জীবনের সেইসব অধ্যায়জানবো, যা শুধু ইতিহাসের পাতা উল্টানোর কাহিনি নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার অমূল্য সম্পদ।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছর। মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার যখন চরম সীমায়, তখন রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে প্রথম দলটি হাবশায় (ইথিওপিয়া) হিজরাত করলেন। সেই দলে ছিলেন উসমান (রা.) ও তার স্ত্রী রুকাইয়্যা (রা.)। হযরত আনাস (রা.) বলেন, ‘হাবশার মাটিতে প্রথম হিজরাতকারী উসমান ও তার স্ত্রী রুকাইয়্যা।’ রাসুল (সা.) দীর্ঘদিন তাদের কোনো খবর না পেয়ে উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন। এক কুরাইশ মহিলা সংবাদ দিলেন, ‘আমি দেখেছি, রুকাইয়্যা গাধার ওপর সওয়ার, আর উসমান গাধাটি হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’ রাসুল (সা.) তখন তার জন্য দোয়া করেন।

হাবশায় অবস্থানকালে তাদের সন্তান আবদুল্লাহ জন্মগ্রহণ করে। লোকেরা বলত, ‘সর্বোত্তম জুটি দেখতে চাইলে উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখো।’ কিছুদিন পর মক্কায় গুজব ছড়ায় মক্কার নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহণ করেছে। সেই গুজবে উসমান (রা.) মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু সত্যি ঘটনা ছিল উল্টো। পরে রাসুল (সা.) যখন মদীনায় হিজরাত করলেন, উসমানও পুনরায় হিজরাত করলেন। এভাবেই তিনি ‘যুল-হিজরাতাইন’—দুই হিজরতের অধিকারী হলেন।

একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া সকল যুদ্ধে তিনি রাসুল (সা.)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেছেন। বদর যুদ্ধের সময় স্ত্রী রুকাইয়্যা অসুস্থ ছিলেন। রাসূলের নির্দেশে তিনি তার সেবায় মদীনায় থেকে যান। বদরের বিজয়সংবাদ মদীনায় আসার দিনই রুকাইয়্যা ইন্তেকাল করেন। রাসূল (সা.) উসমানের জন্য বদরের যোদ্ধাদের মতো সওয়াব ও গনীমতের অংশ ঘোষণা করেন।

রুকাইয়্যার মৃত্যুর পর হিজরী তৃতীয় সনে রাসুল (সা.) তাঁর দ্বিতীয় কন্যা উম্মু কুলসুমকে উসমানের সাথে বিবাহ দেন। উম্মু কুলসুম নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে রাসল (সা.) বলেন, ‘আমার যদি তৃতীয় কোনো মেয়ে থাকতো, তাকেও আমি উসমানের সাথে বিয়ে দিতাম।’

জা. অর্থনীতি/ উমর