সিভিওতে সলভেন্ট উৎপাদন বন্ধ
  • নাফথা সংকটে সলভেন্ট উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ
  • ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধে কাঁচামাল সরবরাহ নেই
  • যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাফথার দাম বেড়েছে
  • লোকসানের আশঙ্কায় উৎপাদন বন্ধ রেখেছে সিভিও
  • বিকল্প জ্বালানি পণ্য উৎপাদনে ভাবনা চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: কাঁচামালের সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রামের সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের সলভেন্ট বা শিল্প দ্রাবক উৎপাদন। অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সময় পাওয়া উপজাত নাফথা দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। চট্টগ্রামে একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে আসে এই কাঁচামাল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেলের অভাবে এই শোধনাগার বন্ধ থাকায় নাফথার উৎপাদনও বন্ধ আছে। ফলে বিপাকে পড়েছে সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল। 

নাফথা পেট্রোলিয়াম শোধনাগারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপজাত নাফথা সাধারণত হালকা হাইড্রোকার্বন মিশ্রণ, যা পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একমাত্র ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নাফথা তৈরি হয়। পরে চাহিদানুসারে তা বেসরকারি রিফাইনারিগুলোতে সরবরাহ করা হয়। বাকিটা বিদেশে রপ্তানি করা হয়। 

নাফথা অত্যন্ত দাহ্য হাইড্রোকার্বন মিশ্রণ। এটি মূলত শিল্পকারখানায় জ্বালানি ও দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এটি। স্টিম ক্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে এটি থেকে ইথিলিন ও প্রোপিলিন তৈরি করা হয়, যা পরে প্লাস্টিক, রেজিন ও অন্যান্য রাসায়নিক পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া জ্বালানি হিসেবে নাফথা পরিশোধনের মাধ্যমে উচ্চ-অকটেন পেট্রল বা গ্যাসোলিন তৈরি করা হয়। 

ক্যাম্পিং স্টোভ ও তেলের লণ্ঠনে হালকা জ্বালানি হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়। নাফথা শিল্পদ্রাবক হিসেবে চমৎকার কাজ করে। এটি তেল-ভিত্তিক রঙ, বার্নিশ, ডিটারজেন্ট এবং ক্লিনিং শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া রাবার শিল্পের দ্রাবক হিসেবে এবং চামড়া পরিষ্কার করার শিল্পেও নাফথা ব্যবহৃত হয়।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল সূত্রে জানা যায়, সিভিওতে বছরে ৩০ হাজার টন নাফথার পরিশোধ করার সক্ষমতা আছে। এর বিপরীতে গত অর্থবছরে কারখানাটি ১০ হাজার ২১৪ টন পরিশোধন করে, যা সক্ষমতার ৩৪ শতাংশ। সে হিসাবে নাফথা পরিশোধন করে মাসে ৮৫০ টন হাইড্রো কার্বন সলভেন্ট উৎপাদন করছে সিভিও। এর পুরোটাই রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের মাধ্যমে বাজারে বিপণন করা হয়। 

ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর আমাদের প্ল্যান্টে অপরিশোধিত তেল আসেনি। ফলে আমাদের এখন নাফথাসহ কোনো জ্বালানি পণ্য পরিশোধন হচ্ছে না। ফলে আমরা কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে রিফাইন করার জন্য জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছি না। তাই কিছু কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তাও বলা যাচ্ছে না। 

এ বিষয়ে সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব খাজা মঈন উদ্দিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘নাফথা না পাওয়ায় আমাদের পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নাফথার দাম ৫০ শতাংশের মতো বেড়ে গেছে। কিন্তু বিপিসি তো দাম বাড়ায়নি। ফলে লোকসানের শঙ্কায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দৈনিক ১৫০ টন ডিজেল পরিশোধনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু আমদানি করার সুযোগ কম থাকায় এ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত।’

এদিকে সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের চেয়ারম্যান শামসুল আলম শামীম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘নাফথা না পাওয়ার কারণে আমাদের সলভেন্ট উৎপাদন বন্ধ আছে। এ ছাড়া রিচ কনডেনসেট আমদানির জন্য আমাদের অনুমোদন থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ দামের কারণে আমদানি করতে পারছি না। এসব জটিলতার জন্য ভবিষ্যতে আমরা নতুন নতুন জ্বালানিপণ্য উৎপাদনের চিন্তা-ভাবনা করছি।’

পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল ২০২৪-২৫ হিসাববছরে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) করেছে ৩ টাকা ৮২ পয়সা, আগের হিসাববছরে যা ছিল ২ টাকা ৩৪ পয়সা। আর গত ৩০ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৭৮ পয়সায় (পুনর্মূল্যায়িত)। একই সময়ে ইপিএস ছিল তিন টাকা ৯৬ পয়সা। সমাপ্ত ২০২৪-২৫ হিসাববছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১১ শতাংশ নগদ এবং ৯ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছে সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের পর্ষদ।

উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে তালিকাভুক্ত সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পুঞ্জীভূত মুনাফার পরিমাণ ৫ কোটি টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ৩ কোটি ৩ লাখ। এর ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ রয়েছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ১৮ দশমিক ৪০, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে দশমিক ১৫ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে বাকি ৩৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।