সংকটের বৃত্তে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে আবারও মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে ঘনীভূত হচ্ছে আশঙ্কার মেঘ। একদিকে পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশিতে রণতরীর গর্জন অন্যদিকে কূটনীতির রুদ্ধদ্বার কক্ষে সমঝোতার টেবিলে অস্থির পায়চারী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে যে যুদ্ধবিরতির আশা জাগিয়েছিল তা এখন এক সূক্ষ্ম সুতোর ওপর ঝুলে আছে। হোয়াইট হাউজের ঘোষণা আর তেহরানের অনমনীয় অবস্থানের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসী ভাবছে— এটি কি কেবলই কালক্ষেপণ, নাকি টেকসই শান্তির পথে কোনো সাহসী পদক্ষেপ?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অস্থিরতার পারদ যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। মূলত গত ৮ এপ্রিল এক শর্তসাপেক্ষ চুক্তির মাধ্যমে দুই সপ্তাহের জন্য শান্ত থাকতে রাজি হয়েছিল তেহরান ও ওয়াশিংটন। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই চুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্ববাজারে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে এই নৌপথটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া তথ্য মতে, যুদ্ধবিরতির প্রধানতম শর্তই ছিল ইরানকে এই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে হবে। ইরানও প্রাথমিক আলোচনায় নমনীয় হয়ে তাদের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে দুই সপ্তাহের জন্য এই পথে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কূটনীতির এই পথটি যতটা মসৃণ মনে হয়েছিল বাস্তবে তা ততটাই কণ্টকাকীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ দেখা গেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যে হওয়া বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক দিন ধরে চলা দীর্ঘ আলোচনার পর সবার নজর ছিল কোনো একটি বড় ধরনের ব্রেকথ্রু বা সমাধানের দিকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আলোচনা থেকে আশাব্যঞ্জক কিছু বেরিয়ে আসেনি। কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সকে খালি হাতে ওয়াশিংটনে ফিরতে হয়েছে। এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার রেশ ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে এবং নিষেধাজ্ঞার তীব্রতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক চাপকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

সংঘাতের এই বৃত্তটি কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর আঁচ লেগেছে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও। মূল সংঘাতের সমান্তরালে ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্তেও একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। ১৯৯৩ সালের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পর গত ১৬ এপ্রিল ১০ দিনের এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এ প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুরুতে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, লেবাননের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা গেল পরদিনই। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর থেকে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার না করায় ক্ষুব্ধ তেহরান ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

বর্তমান চুক্তির অন্যতম জটিল দিক হলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও পাল্টা হামলার অধিকার। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েল যে কোনো সময় তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বা চলমান হামলার মোকাবিলায় ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বজায় রাখবে। অর্থাৎ যে কোনো মুহূর্তে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। অন্যদিকে লেবানন সরকারের ওপর বড় ধরনের দায়বদ্ধতা চাপানো হয়েছে। চুক্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহসহ অন্য যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী যাতে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলা চালাতে না পারে তার জন্য লেবানন সরকারকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটটি এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে আস্থার অভাবই সবচেয়ে বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে অন্যদিকে ইরান চাইছে তাদের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেওয়া হোক। কিন্তু এই দুই মেরুর দাবির মাঝখানে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা যার প্রভাব পড়বে প্রতিটি সাধারণ মানুষের পকেটে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণাটি সাময়িকভাবে বড় কোনো যুদ্ধ ঠেকিয়ে দিলেও তা স্থায়ী সমাধানের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত মিটে না যাচ্ছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হচ্ছে ততক্ষণ এই যুদ্ধবিরতি একটি ভঙ্গুর ঢাল ছাড়া আর কিছুই নয়। ইসলামাবাদের ব্যর্থ বৈঠক প্রমাণ করেছে যে, কেবল মৌখিক আশ্বাস দিয়ে এই জটিল জট খোলা সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোয় কূটনীতির নতুন কোনো পথে এই সংকটের সমাধান আসে, নাকি পারস্য উপসাগর আবারও কোনো প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধের সাক্ষী হয়।