- গত ৫ বছরে কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১০৫ শতাংশ, লেনদেন বেড়েছে ১০০ শতাংশ
- এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বেড়েছে ১৫.৩০ শতাংশ
- একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেন কমেছে ১.৭৫ শতাংশ
- প্রবাসী ব্যয় কমেছে ০.৫৫ শতাংশ, ৯০ শতাংশের বেশি ব্যয় কেনাকাটায়
- নগদ উত্তোলন তুলনামূলক কম, বিদেশে মোট ব্যয় ৬৯৭ কোটি টাকা
- দেশে বিদেশিদের ব্যয় ২৬৭ কোটি টাকা, বাংলাদেশিদের বিদেশে খরচ ২.৬১ শতাংশ
আহমেদ ফেরদাউস খান, ঢাকা : বাংলাদেশে কার্ড-ভিত্তিক লেনদেন খাতে গত পাঁচ বছরে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে, তা দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। ডেবিট, ক্রেডিট এবং প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার শুধু সংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং লেনদেনের পরিমাণ ও ধরন— উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বাজারে কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা শক্তিশালী হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে কিছুটা শ্লথতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে কার্ডের মোট সংখ্যা ১০৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের মার্চ মাসে যেখানে ডেবিট, ক্রেডিট এবং প্রি-পেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ কোটি ২৪ লাখ, ১৬ লাখ ৯৮ হাজার এবং ৮ লাখ ১১ হাজার, সেখানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৪ লাখ, ২৭ লাখ ১ হাজার এবং ৮১ লাখ ২০ হাজারে। এই প্রবৃদ্ধি থেকে স্পষ্ট যে, কার্ডভিত্তিক লেনদেন এখন আর কেবল শহুরে বা উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি বিস্তৃত জনসমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।
খাত-বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন পেমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং আয় ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের সহজতার কারণে প্রি-পেইড কার্ডের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে ডেবিট কার্ডের ব্যবহার ৩৬ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা একটি স্থিতিশীল এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। শুধু কার্ডের সংখ্যা নয়, লেনদেনের পরিমাণেও ঘটেছে বড় ধরনের উল্লম্ফন। ২০২১ সালের মার্চ মাসে কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৯০৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ এবং নগদ নির্ভরতা কমার একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।
এই প্রবৃদ্ধির মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে প্রি-পেইড কার্ডের ব্যবহার, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া। এর বড় অংশই ডিপার্টমেন্ট স্টোরে ব্যয় হয়েছে, যা মোট অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের প্রায় অর্ধেক। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ভোক্তারা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন। সুপারশপ, চেইন স্টোর এবং আধুনিক খুচরা বাজারের বিস্তারও এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।
তবে মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে অভ্যন্তরীণ ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জানুয়ারিতে যেখানে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৭২০ কোটি টাকা, সেখানে ফেব্রুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২২ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। এই পতনটি মৌসুমি কারণ, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও স্পষ্টভাবে নিম্নমুখী। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্তঃসীমান্ত ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যয়ও শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড লেনদেন ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে গেছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য পতন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৯৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ৩৭৭ কোটি টাকা, ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ২৭৯ কোটি টাকা এবং প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি নাগরিকদের কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশি কার্ডধারীরা বিদেশে প্রায় ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছেন, যা বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে (২৯.৬৬ শতাংশ) এবং খুচরা আউটলেট পরিষেবায় (১৭.৩২ শতাংশ)। এছাড়া ওষুধ ও ফার্মেসি, পরিবহন এবং ব্যবসায়িক পরিষেবাও উল্লেখযোগ্য খাত হিসেবে উঠে এসেছে। ডেবিট কার্ড ব্যবহারে ব্যবসায়িক পরিষেবা, ডিপার্টমেন্ট স্টোর এবং নগদ উত্তোলন প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রিপেইড কার্ডে সরকারি সেবা এবং ব্যবসায়িক খাতে ব্যয় বেশি হয়েছে, যা এই কার্ডগুলোর উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে রয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, ভারত এবং মালয়েশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে। এটি ইঙ্গিত করে যে, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ এবং ই-কমার্স— সব মিলিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের বৈশ্বিক সংযোগ ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে বিদেশি কার্ডধারীদের বাংলাদেশে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ডিপার্টমেন্ট স্টোর সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে উঠে এসেছে, যা মোট লেনদেনের প্রায় ৪১ শতাংশ। নগদ উত্তোলন, খুচরা আউটলেট এবং পরিবহন খাতেও উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই খাতে ২২ দশমিক ৬০ শতাংশ পতন লক্ষ করা গেছে, যা পর্যটন বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সাময়িক মন্দার ইঙ্গিত দিতে পারে।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বিতরণযোগ্য ঋণের ক্ষেত্রেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র দেখা যায়। মোট অনুমোদিত ক্রেডিট সীমা ৪১ কোটি ৮২ লাখ ৯০ হাজার টাকা হলেও বকেয়া রয়েছে ১৪ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা এখনও তাদের ক্রেডিট সীমার মধ্যে থেকে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যয় করছেন, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক। অভ্যন্তরীণ লেনদেনের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট ব্যয়ের ৯০ দশমিক ৭৪ শতাংশই কেনাকাটার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। নগদ উত্তোলন ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং তহবিল স্থানান্তর ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষ এখন আর কার্ডকে শুধু নগদ উত্তোলনের মাধ্যম হিসেবে দেখছে না; বরং সরাসরি পেমেন্টের জন্য এটি ব্যবহার করছে।
তবে এই অগ্রগতির মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে ডিজিটাল অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, আর্থিক সাক্ষরতার অভাব এবং ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা কার্ড ব্যবহারের বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রতি আস্থার ঘাটতি অনেক ব্যবহারকারীকে এখনও নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া বাংলাদেশের শক্তিশালী নগদ-নির্ভর সংস্কৃতি এবং অসংগঠিত অর্থনীতি ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তারকে ধীর করে দিচ্ছে। উচ্চ লেনদেন খরচ এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাও এই খাতে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক এবং ৩৫টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফসি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে ৫৬টি তফসিলি ব্যাংক এবং একটি এনবিএফ কার্ড সেবা প্রদান করছে। এই ৫৭টি ব্যাংক/এনবিএফের মধ্যে ৪৯টি (৪৮টি ব্যাংক, একটি এনবিএফসি) ক্রেডিট কার্ড, ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রি-পেইড কার্ডসহ বিভিন্ন কার্ড সেবা প্রদান করে)।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কার্ডভিত্তিক লেনদেন খাত বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং ডিজিটাল গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে কিছুটা মন্দা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। তবে যথাযথ নীতি সহায়তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।’

