এক গৃহঋণে ছয়বার কর

রহমত রহমান, ঢাকা: আবগারি শুল্ক এক ধরনের পরোক্ষ কর। এটি কোনো ব্যক্তির আয় বা মুনাফার ওপর সরাসরি ধার্য করা হয় না। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য উৎপাদন, সেবা গ্রহণ বা আর্থিক কার্যক্রমের ওপর এটি আরোপ করা হয়। বিশেষ করে ব্যাংক লেনদেনে আবগারি শুল্ক কর্তন করা হয়। কোনো গ্রাহকের ব্যাংকে এফডিআর, সঞ্চয়ী হিসাব বা অন্যান্য হিসাবের অর্থ থেকে আয় করলে আবগারি শুল্ক কাটা হয়, যা স্বীকৃত। কিন্তু বিস্ময়করভাবে ঋণ হিসাব থেকেও একই হারে আবগারি শুল্ক কেটে নিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

বিশেষ করে গৃহঋণ, ব্যবসা ঋণের হিসাব থেকেও শুল্ক কাটার বিষয়টি জাতীয় অর্থনীতির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ২০ বছর মেয়াদি গৃহঋণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০ বছর পর্যন্তই আবগারি শুল্ক কাটা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঋণ থেকে অন্তত ছয়বার কর আদায় করা হয়েছে। ঋণ হিসাব ও করের নির্ভুল হিসাব করতে ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক সহযোগিতা করেছেন।

 বিশ্লেষণে দেখা যায়, বসুন্ধরায় একটি ফ্ল্যাট কিনতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের রাজধানীর একটি শাখা থেকে গৃহঋণ নেন আবদুল ওহাব (ছদ্মনাম)। ইউটিলিটিসহ ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ২২০০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটের জন্য ২০ বছরের জন্য ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ঋণ দেয় ব্যাংক। বাকি ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৬৯ লাখ টাকা তিনি নিজ থেকে পরিশোধ করেন। প্রথমেই এই ঋণের জন্য গ্রাহক থেকে ৩ হাজার টাকা ভ্যাট কেটে নেয় সরকার। আর প্রসেসিং বাবদ ব্যাংক নিল ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের খরচ বাদে বাকি টাকার ওপর সরকারকে আবার আয়কর দিতে হবে। এর অর্থ হলো একই ঋণে গ্রাহক ভ্যাট ও আয়কর দুটিই দিলেন।

শুধু তাই নয়, গ্রাহক ফ্ল্যাটের জন্য নিজ থেকে যে ৬৯ লাখ টাকা দিলেন, তার ওপর তিনি আগেই আয়কর পরিশোধ করে ফাইলে দেখিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ ৬৯ লাখ টাকার ওপর অন্তত ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা আয়কর পরিশোধ করা হয়েছে (২০২৪-২৫ করবর্ষের আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী)। এর মানে এই ফ্ল্যাট কিনতে গ্রাহককে মোট তিন দফায় কর দিতে হলো। এর আগেই ফ্ল্যাট নিবন্ধনে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ভ্যাট ও গেইন ট্যাক্সও আছে। আইন অনুযায়ী, গেইন ট্যাক্স বিক্রেতার দেওয়ার কথা থাকলেও দিতে হয় ক্রেতাকেই। সুতরাং ফ্ল্যাট কিনতে গ্রাহককে চতুর্থ দফায় কর দিতে হলো। আবার ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ৬৯ লাখ টাকার ওপর গেইন ট্যাক্স দিতে হলো। অর্থাৎ ক্রেতাকে পঞ্চম দফায় কর দিতে হলো।

 গৃহঋণে আবগারি শুল্ক

গৃহঋণের জন্য নিবন্ধন পর্যন্ত অন্তত ৫ বার রাজস্ব দিয়েছেন গ্রাহক। এবার দিলেন আবগারি শুল্ক। গ্রাহককে ২০ বছর পর্যন্ত ঋণের বোঝার সঙ্গে ব্যাংকের সুদ টানতে হবে। তার ওপর আবার আবগারি শুল্কও দিতে হবে। ব্যাংকে জমা টাকা থেকে যেহেতু সুদ মিলে, সেখান থেকে আবগারি শুল্ক নিলে সমস্যা নেই। কিন্তু ঋণতো কোনো আয় নয়। তবু আবদুল ওহাবকে আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। 

ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ১ কোটি ৬১ লাখ টাকার মধ্যে প্রথম ১৩ বছর বা ১৫২ মাস প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট বা মূল ১ কোটি টাকার ওপর প্রতিবছর ১৫ হাজার টাকা হিসেবে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। পরের চার বছর প্রতিবছর ৫ হাজার টাকা করে চার বছরে মোট আবগারি শুল্ক দিতে হবে ২০ হাজার টাকা। পরের তিন বছর প্রতিবছর ৩ হাজার টাকা করে মোট ৯ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হবে। ২০ বছরে এই গ্রাহককে মোট আবগারি শুল্ক দিতে হবে (১,৯৫,০০০+২০,০০০+৯,০০০) ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ ষষ্ঠ দফায় এই গ্রাহক থেকে আবগারি শুল্কের নামে ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা সরকার নিয়ে নেবে। আবার ব্যাংক ১ কোটি ৬১ লাখ টাকায় ২০ বছরে এই গ্রাহক থেকে নেবে মোট ২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫৯ টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক ২০ বছরে এই গ্রাহক থেকে বাড়তি ৭৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫৯ টাকা বেশি নিয়েছে। এই টাকার মধ্যে ব্যাংক যে আয় করবে, তার ওপর সরকারকে কর দেবে। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে গ্রাহক থেকে যে টাকা নিয়ে আয় করল, তার কর তো এই গ্রাহক-ই দিলেন।

আবদুল ওহাব জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘সবার স্বপ্ন থাকে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাট করে মাথা গোঁজার। ঋণ নিয়ে ও আমার কাছে থাকা টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনলাম। কিন্তু ঋণ প্রসেসিং থেকে শুরু করে শোধ হওয়া পর‌্যন্ত অন্তত ছয়বার কর দিলাম। আবার ঋণের ওপর আবগারি শুল্ক। আমি তো এই টাকা নিয়ে হালুয়া রুটি খাইনি বা ব্যবসাও করিনি। তাহলে ঋণ অ্যাকাউন্টের ওপর আবগারি শুল্ক নেবে কেন? শুধু আমি না—যারা গৃহঋণ নেবেন এমন সব গ্রাহককে একইভাবে আবগারি শুল্ক দিতে হয়।

একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে জানান, শুধু গৃহঋণ নয়— সব ধরনের ঋণ হিসাব থেকে একই হারে আবগারি শুল্ক কর্তন করা হয়। যদিও ঋণ হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কাটার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের আবাসন খাতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়। এ বেচাকেনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ যায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা।

এনবিআর সূত্রমতে, প্রতিবছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে কোনো ব্যাংক হিসাবে আমানত বা স্থিতির পরিমাণ যদি একবার ৩ লাখ টাকা বা তার ওপরের স্তরগুলোর সীমা অন্তত একবার স্পর্শ করে, তাহলে নির্দিষ্ট হারে আবগারি শুল্ক দিতে হয়। একাধিকবার স্পর্শ করলেও একবারই আবগারি শুল্ক কাটা হয়। একজন গ্রাহকের একাধিক ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক আরোপ হয়, এমন স্থিতি থাকলেও প্রতিটি হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কাটা হবে। 

প্রতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে স্থিতি কোনো সময়ে ৩ লাখ টাকার বেশি হলে পর্যায়ক্রমে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন হারে এই শুল্ক কাটা হয়। বর্তমানে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতে কোনো আবগারি শুল্ক নেই। ৩ লাখ ১ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫০ টাকা কর্তন করা হয়। ৫ লাখ ১ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৫০ টাকা কর্তন করা হয়। ১০ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জমায় ৩ হাজার টাকা, ৫০ লাখ ১ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা, ১ কোটি ১ টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা, ২ কোটি ১ টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার ওপরে যেকোনো পরিমাণ জমার ওপর ৫০ হাজার আবগারি শুল্ক রয়েছে।

ঋণ হিসাবে আবগারি শুল্ক কাটার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘এটা আমাদের বিষয় না, এনবিআরের ইস্যু। আমরা এনবিআরের সঙ্গে যখন ইন্টারনাল আলাপ করি, তখন আমাদের কাছে মনে হয় যে, লোন মানেই তো ডেবিট। তার ওপর যদি আবার আবগারি শুল্ক হয় আরও ডেবিট হয়। কিন্তু এনবিআর অ্যাকাউন্টের ওপর আবগারি শুল্ক ধার্য করেছে। সেটা ডিপোজিট অ্যাকাউন্ট হোক বা লোন অ্যাকাউন্ট হোক—একই ইস্যু। যে কারণে ঋণের ওপরও আবগারি শুল্ক রয়ে গেছে। এখানে আমাদের আসলে কিছু করার নেই।’

আবগারি শুল্ক থেকে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। আইন অনুযায়ী, ডেবিট এবং ক্রেডিট-দুই ব্যাংক হিসাব থেকেই আবগারি শুল্ক কর্তন করা হয়। কোনো ব্যক্তির আয় থেকে বা ব্যাংকে টাকা থাকলে, সেখান থেকে বা সেই হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কর্তন করা যুক্তিযুক্ত। আর ঋণ তো মানুষ বিপদে না পড়লে নেয় না। তাহলে ঋণ হিসাব থেকে আবগারি শুল্ক কর্তন করা হয় কেন, জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কখনও ভেবে দেখিনি। ঋণ হিসাবে কখনও আবগারি শুল্ক কর্তন করা উচিত নয়। বিষয়টি আমরা ভেবে দেখব।’