বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) আসন্ন বাজেটের জন্য একটি প্রস্তাব করেছে— বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে ৫ শতাংশ ভ্যাটের বদলে প্রতি ভরি স্বর্ণে মাত্র ২ হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণ করা হোক। বর্তমানে এক ভরি স্বর্ণ বিক্রিতে ভ্যাট আসে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, কিন্তু বাজুস ভ্যাট দিতে চাচ্ছে মাত্র ২ হাজার টাকা। এ হিসাবে ভরিপ্রতি সরকারের রাজস্ব কমবে অন্তত ১০ হাজার টাকা। বাজুসের এ প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে— স্বর্ণের দাম বেড়েছে তাই ভ্যাটের বোঝা বেশি, ক্রেতারা ভ্যাট দিতে চান না, ফলে আদায় হয় না। কিন্তু এই যুক্তি আসলে একটি বৃহত্তর সমস্যাকে আড়াল করছে : জুয়েলারি খাত বছরের পর বছর ধরে সঙ্ঘবদ্ধভাবে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে, আর এখন সেই ফাঁকিকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
গতকাল জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকায় ‘গয়নার ওজনে ভ্যাট দিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিতে চায় বাজুস’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যগুলো দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। এনবিআরের হিসাবে, এই খাত থেকে বছরে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায় সম্ভব। কিন্তু আদায় হচ্ছে মাত্র ১৩৮ কোটি টাকা, যা মোট আদায় সম্ভাবনার ১৪ শতাংশেরও কম। বাজুস নেতারা স্বীকার করছে, ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ জুয়েলারি দোকান ভ্যাট দেয় না। রাজধানীসহ ৩২টি এলাকায় ২ হাজার ১৬৯টি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধনই নেই। খোদ এনবিআরের কর্মকর্তারাই বলছেন, নিবন্ধিত দোকানগুলোও সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় না— দিলে মাসে ১৫ কোটি টাকার বদলে ৩৭ কোটি টাকা আদায় হতো। অর্থাৎ সমস্যাটা ভ্যাটের হার নয়, সমস্যা হলো আদায়ের ব্যবস্থা না থাকা এবং ফাঁকির সুযোগ থাকা।
বাজুসের সভাপতি বলেছেন, ওজনভিত্তিক নির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণ করলে আদায় ছয় গুণ বাড়বে। এই দাবির গণিতটা একটু যাচাই করা দরকার। ছয় গুণ মানে বর্তমান ১৩৮ কোটির ছয় গুণ, অর্থাৎ প্রায় ৮২৮ কোটি টাকা। কিন্তু যথানিয়মে বর্তমান ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় হলেই এক হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় হওয়ার কথা। তাহলে ভ্যাট প্রদান কমিয়ে আদায় বাড়ানোর প্রস্তাবটি আসলে কম রাজস্বেই সন্তুষ্ট থাকার প্রস্তাব। এটি মূলত বাংলাদেশের রাজস্বনীতির বিপরীত। সরকার যেখানে রাজস্ব বাড়াতে চাচ্ছে, সেখানে বাজুস বিপরীত দিকে হাঁটার প্রস্তাব দিচ্ছে।
ভ্যাট আদায়ে যে সমস্যার কথা বাজুস বলছে, তার সমাধান ভ্যাট কমানোয় নয়— সমাধান হলো ফাঁকির পথ বন্ধ করায়। যে ২ হাজারেরও বেশি দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই, তাদের অবিলম্বে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধন না থাকলে লাইসেন্স বাতিলের বিধান কার্যকর করতে হবে। ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়া সরাসরি প্রতারণা— এই অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পয়েন্ট-অব-সেল মেশিন বা ডিজিটাল রসিদ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করলে লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআরে পৌঁছাবে, ফাঁকি দেওয়া কঠিন হবে।
বাজুসের যুক্তির একটি অংশে সত্যতা আছে— যখন ৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন স্বর্ণের দাম ছিল বর্তমানের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে স্বর্ণের দাম বাড়লেও গয়না তৈরির মজুরি বা মূল্য সংযোজন আনুপাতিক হারে বাড়েনি। ফলে একই হারে ভ্যাট দিতে গিয়ে ক্রেতাকে আগের চেয়ে তিন গুণ বেশি টাকা দিতে হচ্ছে। এই বাড়তি চাপ ক্রেতার ভ্যাট-বিমুখতার একটি বাস্তব কারণ— এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কিন্তু সমস্যার এই সত্যিকারের অংশটুকুর সমাধান ওজনভিত্তিক নির্দিষ্ট ভ্যাট নয়। কারণ ওজনভিত্তিক পদ্ধতিতে স্বর্ণের মূল উপকরণের মূল্য এবং গহনা তৈরির মজুরি— দুটো একসঙ্গে মিলিয়ে একটি ছোট অঙ্কের কর বসানো হবে, যা রাজস্বের বিপুল ক্ষতি ঘটাবে। সঠিক সমাধান হলো ভ্যাটের মূলনীতিতে ফিরে যাওয়া। ভ্যাটের আক্ষরিক অর্থই হলো ‘মূল্য সংযোজন কর’— অর্থাৎ কর বসবে শুধু সেই অংশে, যেখানে নতুন মূল্য যোগ হয়েছে।
সরকারের রাজস্ব ঘাটতি এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণ খাতের মতো একটি সমৃদ্ধ ব্যবসায়িক খাত থেকে প্রাপ্য রাজস্ব আদায় না করে বরং সেটি আরও কমানোর প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে নীতিগতভাবে বিপজ্জনক নজির। এনবিআরকে বাজুসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং পরিবর্তে কার্যকর নিবন্ধন অভিযান, ডিজিটাল লেনদেন বাধ্যতামূলক করা ও ভ্যাট ফাঁকিতে জরিমানার বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ভ্যাট ফাঁকির সংস্কৃতিকে নীতিমালায় বৈধতা দেওয়া নয়— ফাঁকি বন্ধ করাই হোক সরকারের অগ্রাধিকার।

