- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় ২৪৭ কোটি টাকা
- বাস্তবায়নে অগ্রগতি মাত্র ৫৫ দশমিক ৭০ শতাংশ
- চীনের ঠিকাদারের কাজ ছেড়ে দেওয়ায় বাস্তবায়নে ধীরগতি
- নতুন টেন্ডারের কারণে বেড়েছে সব ধরনের পণ্যের দাম
- সংশোধনে এক ধাপে ব্যয় বাড়ানো হয়
- প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চেয়েছে পিইসি
- ‘জবাবদিহিতার সংস্কৃতি এখনো সঠিকভাবে চালু হয়নি, যার ফলে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে’। -ড. মুস্তফা কে মুজেরি
মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: ঢাকা মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের যানজট নিরসনে ২০১৪ সালে মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল ডুয়েলগেজ নির্মাণের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। তবে এক যুগ পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। জমি অধিগ্রহণে ধীরগতি, ঠিকাদারের কাজ ছেড়ে দেওয়া এবং নতুন টেন্ডার হওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বাস্তবায়নে গতি আসেনি প্রকল্পটিতে।
জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল (সোমবার) পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে প্রকল্পটি নিয়ে যাচাই-বাছাই করে মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। সভা শেষে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ধীরগতির সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চেয়েছে মূল্যায়ন কমিটি।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০১৪ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের মিটারগেজ রেললাইনের সমান ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। চার বছরমেয়াদি এই প্রকল্পে মূল অনুমোদিত ব্যয় ধরা হয় ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ছিল ১২৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর অনুদান প্রকল্পে অনুদান হিসাবে ছিল ২৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি রেখে বিভিন্ন সময়ে মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল প্রথম সংশোধনীতে একলাফে ২৮০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন বেড়ে দাঁড়ায় ৪০৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। মেয়াদকাল ধরা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এরপর বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত শুধুমাত্র মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় হয়েছে ২৪৭ কোটি টাকা। এ সময় পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি ৫৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
প্রকল্পের ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. সেলিম রউফ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘টেন্ডার অনুযায়ী চীনের পণ্যের রেট ছিল কম। পরে দাম বাড়ার কারণে চীনের ঠিকাদার কাজ ছেড়ে দেয়। নতুন করে টেন্ডার করার কারণে প্রকল্পে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে চীন থেকে আবার নতুন করে পণ্য আনা হবে এবং কাজ বাস্তবায়নে গতি আসবে। কাজ একেবারে হয়নি এমন ধারণা ঠিক নয়।’
জানা গেছে, জুরাইন লেভেলক্রসিং গেট থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের রেলস্টেশন পর্যন্ত ২৯ দশমিক ৯১ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ করা হবে। ২২টি মাইনর সেতু, ৫টি স্টেশন ভবন নির্মাণ (নারায়ণগঞ্জ, চাষাড়া, ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুর) নির্মাণ করা হবে। এছাড়া প্ল্যাটফর্ম ও প্ল্যাটফর্ম শেড নির্মাণ, ১১টি লেভেল ক্রসিং গেট এবং নারায়ণগঞ্জের ইয়ার্ডে একটি ব্রডগেজ ও একটি মিটারগেজ ওয়াশপিট নির্মাণ করা হবে।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের রেল পরিবহন উইংয়ের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে পিইসি সভায় বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা হয়েছে। প্রকল্পটিতে দুই বছর মেয়াদ বৃদ্ধিসহ ব্যয় সামান্য বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে প্রকল্পটির ধীর গতির কারণ সম্পকে জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ২০২২ সালে চীনের ঠিকাদার কাজ সম্পূর্ণ না করে কেন চলে গেছে, তার সঠিক কারণ জানা দরকার। ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেটাও বের করা দরকার।
আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অপচয় আর ধীরগতির প্রকল্প এভাবে চলতে পারে না। প্রকল্পের অগ্রগতির ধীরগতির কারণ জানতে চাওয়া হবে। উত্তর সন্তোষজনক না হলে এ ধরনের প্রকল্প বন্ধ করা হতে পারে।
মানসম্মত কাজের মাধ্যমে প্রকল্পটি সফলভাবে শেষ হওয়া উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী। জাতীয় অর্থনীতিকে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি অর্থের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত সচেতন হতে হবে যাতে কোনোভাবেই অর্থের অপচয় না ঘটে। প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত চীনা ঠিকাদাররা কেন ২০২২ সালে কাজ ছেড়ে চলে গেলেন, তা খুঁজে বের করা দরকার। তদন্তের মাধ্যমে যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

