চলুন আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে একটি জীবন্ত গল্প শুনি; আজ একজন মহীয়সী নারীর ধৈর্য, সম্মান ও সংগ্রামের গল্প, আর তার সন্তান, যিনি পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন।
হিন্দ বিনতে ‘উতবা (রা.) ছিলেন অসাধারণ সৌন্দর্য ও মর্যাদার অধিকারিণী। অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়েছিল কুরাইশের একজন ব্যক্তি, ফাকেহ ইবন মুগীরার সঙ্গে। কিন্তু একদিন একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। তার স্বামী কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপবাদ দেন। সেই সময়টি ছিল ইসলাম-পূর্বযুগ, যেখানে সত্যের চেয়ে সন্দেহই অনেক সময় বড় হয়ে উঠত। তার স্বামী একদিন তার তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেলেন। কিন্তু তাঁবুর কাছে একজন লোককে দেখে তিনি কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন। এই ঘটনা ইসলাম-পূর্বযুগে ঘটেছিল, যখন এ ধরনের অভিযোগ অনেক সময় সন্দেহের ভিত্তিতেই করা হতো। হিন্দ দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেন, কিন্তু তার স্বামী নিজের দাবিতে অটল থাকেন। এরপর তারা ইয়েমেনের এক গণকের কাছে বিচার চাইলেন। প্রাক ইসলামি যুগে যে কোনো স্পর্শকাতর বিষয়ে আরবরা দিকনির্দেশনা পেতে গণকদের দ্বারস্থ হতো। এটা নবীজি (সা.)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালেবের দাদার ক্ষেত্রে হয়েছিল। এ বিষয়ে আমরা পরবর্তী সময়ে কখনও আলোচনা করব।
অবশেষে তারা ইয়েমেনের এক গণকের কাছে বিচার নিতে যান। পথিমধ্যে হিন্দের পিতা গণককে পরীক্ষা করার জন্য একটি কৌশল করেন— তিনি একটি গমের দানা একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে রাখেন। উদ্দেশ্য ছিল, গণক সত্যিই কিছু জানে কিনা তা যাচাই করা।
যখন তারা সেখানে পৌঁছান, গণক তাদের আগমনের আগেই ঘটনাটি বলে দেন এবং লুকানো দানার কথাও উল্লেখ করেন। এরপর তিনি ঘোষণা করেন যে হিন্দ সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং পবিত্র। শুধু তাই নয়, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে এই নারী একদিন এমন সন্তানের জন্ম দেবেন, যিনি রাজা হবেন।
এই ঘটনার পর হিন্দের স্বামী অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চান, কিন্তু হিন্দ (রা.) তার প্রতি আর আস্থা রাখতে পারেননি। তিনি সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে আবু সুফিয়ান (রা.) তাকে বিয়ে করেন, এবং এই সংসারেই জন্ম নেন মুয়াবিয়াহ (রা.)— যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলামি খেলাফতের সীমানা সম্প্রসাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ইসলামের আগমনের পর, হিন্দ (রা.) ও মুয়াবিয়াহ (রা.) উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। মুয়াবিয়াহ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর একজন বিশ্বস্ত ওহি লেখক হন। এটি তার সততা ও মর্যাদার প্রমাণ। তার বোন উম্মে হাবিবা (রা.) ছিলেন নবীজির স্ত্রী, তাই তিনি ‘মুমিনদের খালু’ হিসেবেও পরিচিত হন।
খলিফা উমর ইবন খাত্তাব (রা.) তাকে শাম অঞ্চলের শাসক নিযুক্ত করেন। তার শাসনামলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মানুষ তার শাসন ভালোবাসত। প্রায় ২০ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। পরে হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের পর, ইমাম হাসান (রা.) মুসলিম ঐক্যের জন্য খিলাফত তার হাতে তুলে দেন।
সাহাবিদের মধ্যে তার মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উঁচু। প্রখ্যাত আলেমরা তার প্রশংসা করেছেন-তাকে ন্যায়পরায়ণ, সহনশীল ও ক্ষমাশীল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জীবনের শেষ সময়েও তিনি দায়িত্ববোধের পরিচয় দেন, নিজের সম্পদের একটি অংশ রাষ্ট্রের কোষাগারে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
মুয়াবিয়াহ (রা.)-এর মর্যাদা সালাফে সালেহীনের অনেক উঁচু ছিল। তারা তাকে অন্যান্য খলিফার সঙ্গে তুলনা করা অপছন্দ করতেন, বিশেষ করে উমর ইবন আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর সঙ্গে। কারণ তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি ছিলেন।
আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক এমন একটি বক্তব্য দিয়েছেন যা তার প্রতি এই সম্মানের প্রমাণ বহন করে। একইভাবে ইমাম মু’আফা ইবন ইমরানও এই ধরনের তুলনার বিরোধিতা করেছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, মুয়াবিয়াহ (রা.) একজন সাহাবি, যার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে; তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্যে থাকা ব্যক্তি, ওহির লেখক এবং তার আত্মীয় (বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে)।
এই গল্প শুধু একজন মানুষের নয়—এটি ধৈর্য, সততা, সম্মান ও নেতৃত্বের গল্প। হিন্দ (রা.)-এর দৃঢ়তা এবং মুয়াবিয়াহ (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় যে পরীক্ষার পরেই আসে সম্মান, আর চরিত্রই মানুষকে ইতিহাসে অমর করে তোলে।
- শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


