দেশের রাজস্ব কাঠামোয় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) একটি প্রধান স্তম্ভ। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে ভ্যাটের অবদান ক্রমাগত বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নিবন্ধনের বাইরে থাকা লাখো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় তো হচ্ছেই না, বরং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিশাল অংশ শূন্য রিটার্ন দাখিল করছে। আবার অনেকেই নামমাত্র ভ্যাট পরিশোধ করছে। ফলে রাজস্ব আহরণের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকার কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) এ ধরনের ভ্যাট ফাঁকি রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভ্যাট ফাঁকির বিষয়টিকে রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণেই ভ্যাট আহরণ বাড়ানো যাচ্ছে না। এখনও দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর মধ্যে বৃহদংশই সরকারের করজালের বাইরে। আবার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকারও ক্রমেই বাড়ছে। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্বের অন্যতম নিম্ন কর-জিডিপি আহরণের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। ব্যক্তি পর্যায়ে আয়কর ছাড়াও মোবাইল ফোনে কথা বলা থেকে শুরু করে কেনাকাটা, হোটেলে খাওয়া, সিনেমা দেখাসহ দৈনন্দিন লেনদেনে ভোক্তা ও গ্রাহকরা কোনো না কোনোভাবে করজালের আওতায় রয়েছেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর ৯০ শতাংশেরও বেশি এখনও করজালের বাইরে। কর-জিডিপি অনুপাতে গোটা বিশ্বে বেশ পিছিয়ে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও পাকিস্তানের মতো দেশও এ অনুপাতে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশে এ অনুপাতকে ৭ থেকে ৮ শতাংশের ওপরে ওঠানো যাচ্ছে না।
এনবিআরের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান শূন্য ভ্যাট রিটার্ন জমা দিচ্ছে। অর্থাৎ তারা কোনো ভ্যাটই দিচ্ছে না। অথচ সামান্য গড় হিসাবেও দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠান মাসে মাত্র ৩ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিলেই বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আসতে পারত। এনবিআরের সঠিক পদক্ষেপের অভাবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
এ ধরনের চিত্র কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে, কেন এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান শূন্য রিটার্ন দিচ্ছে? এর একটি অংশ হয়তো প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়িক কার্যক্রমহীন বা ক্ষুদ্র। কিন্তু বড় অংশ যে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে আমদানিকারক, ঠিকাদারি এবং বন্ড সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, রেয়াত সুবিধার অপব্যবহার। বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে হাজার হাজার কোটি টাকার ভ্যাট রেয়াত নেওয়া হলেও, সংশ্লিষ্ট রিটার্নে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নেই। ফলে প্রকৃত উৎপাদন, বিক্রয় ও করযোগ্য মূল্য সংযোজন যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি শুধু রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং সৎ করদাতাদের জন্যও একটি অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে।
ভ্যাট ফাঁকির সমস্যার মূলে রয়েছে তদারকির দুর্বলতা ও ডিজিটাইজেশনের অভাব। এখনও ভ্যাট ব্যবস্থার বড় অংশই ডিজিটাইজেশনের অভাব। ফলে তথ্য যাচাই ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ কার্যকরভাবে করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে শূন্য রিটার্ন জমা দেওয়াও যেন এক ধরনের ‘নিরাপদ কৌশল’ হয়ে উঠেছে।
এনবিআর ইতোমধ্যে শূন্য থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত রিটার্ন জমা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে মাঠপর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত পদক্ষেপ ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার। এ লক্ষ্যে কয়েকটি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এক. ভ্যাট ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন জরুরি। ই-ইনভয়েসিং, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং অটোমেটেড অডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে; দুই. ঝুঁকিভিত্তিক অডিট পদ্ধতি চালু করে বড় কর ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করতে হবে; তিন. রেয়াত সুবিধা পেতে হলে সঠিক তথ্যপ্রমাণ ও পরবর্তী যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কর প্রশাসনে জবাবদিহি ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। কারণ একটি দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো কখনই শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে না। দেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় টেকসই রাজস্ব সংগ্রহ অপরিহার্য। শূন্য রিটার্নের এ প্রবণতা যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তবে তা রাজস্ব ঘাটতি বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখন সময় বাস্তবসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার, নইলে সম্ভাবনাময় বিপুল আয় থেকে রাষ্ট্র বঞ্চিত হবে।


