- ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৯১ টন
- ধান সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রার (৬,৬৩৭ টন) বিপরীতে ২১ হাজার ৫১১ টন সংগ্রহ হওয়ায় ৩২৪ শতাংশ সাফল্য এসেছে
- সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৪ টাকা যা কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধান বিক্রিতে উৎসাহিত করেছে
- কৃষিজমি সংকুচিত হলেও উন্নত জাত ও প্রযুক্তির কারণে আমন উৎপাদন ১৭ লাখ টন ছাড়িয়েছে
সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি ক্রমেই সংকুচিত হলেও ফসল উৎপাদন এবং সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। টানা পাঁচ মৌসুমের ব্যর্থতার পর চলতি আমন মৌসুমে খাদ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১০৯ দশমিক ৮১ শতাংশ সংগ্রহ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৩ টনের বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৯১ টন যা সাম্প্রতিক সময়ে এ অঞ্চলের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর ধানের ভালো উৎপাদন এবং সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজার দামের সামঞ্জস্য থাকায় কৃষকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধান বিক্রি করেছেন। ফলে আগের বছরের মতো সংগ্রহে ঘাটতি হয়নি। চলতি মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৪ টাকা, সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা এবং আতপ চাল ৪৯ টাকা নির্ধারণ করে। আগের বছরের তুলনায় ধানে ১ টাকা এবং চালের ক্ষেত্রে ৩ টাকা বাড়ানো হয় যা কৃষকদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ নভেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৯টি জেলায় ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলে। শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬ হাজার টন যা পরে বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার টনে উন্নীত করা হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ধান সংগ্রহে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে। যেখানে ৬ হাজার ৬৩৭ টনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সেখানে সংগ্রহ হয়েছে ২১ হাজার ৫১১ টন অর্থাৎ ৩২৪ শতাংশ। সিদ্ধ ও আতপ চাল সংগ্রহও প্রায় লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি রয়েছে।
অতীতের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫০ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৩ শতাংশ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৮ শতাংশ সংগ্রহ করতে পেরেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। এমনকি ২০২০-২১ অর্থবছরে সংগ্রহ নেমে এসেছিল মাত্র ৫ শতাংশে।
কর্মকর্তারা জানান, চলতি মৌসুমে শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো, জেলা পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করা এবং কৃষকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করায় এই সাফল্য এসেছে। পাশাপাশি মিল মালিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধানের উৎপাদনও এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, আমন মৌসুমে উৎপাদন বেড়ে ১৭ লাখ টন ছাড়িয়েছে যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা আরও সহজ করতে হবে, কৃষকদের দ্রুত অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাদের মতে, উৎপাদন ও সংগ্রহ— দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও টেকসই করতে হলে নীতিগত সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী জাতীয় অর্থনীতিকে জানান, এবার সারা দেশেই ফসল উৎপাদন ভালো হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান-চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলেও এবার ফলন ভালো হওয়ায় সংগ্রহ বাড়ানো গেছে। মৌসুমের শুরুতেই জেলা পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় যুক্তদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া সরকার নির্ধারিত দামে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের সন্তুষ্টি থাকায় সংগ্রহ কার্যক্রম সহজ হয়েছে।’ এই ইতিবাচক ধারা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে উৎপাদন বাড়লেও চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলে আবাদযোগ্য জমি ধীরে ধীরে কমছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে ১৪ লাখ ৩১ হাজার টন চাল উৎপাদন হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জমি কমে ৫ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টরে নেমেছে। তবে উৎপাদন বেড়েছে ১৭ লাখ ৩১ হাজার টন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত জাতের ধান, আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ ও সার ব্যবস্থাপনার উন্নতির ফলে উৎপাদন বেড়েছে। তবে নগরায়ণ, শিল্পায়ন এবং জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে গঠিত এই কৃষি অঞ্চলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো উৎপাদন ১৭ লাখ টন ছাড়িয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৫৮ হাজার টন। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ২৩ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন কমে ১২ লাখ ৭০ হাজার টনে নেমে আসে।
বর্তমানে মোট উৎপাদনের বড় অংশ এসেছে উফশী (উচ্চ ফলনশীল) জাত থেকে। পাশাপাশি হাইব্রিড ও স্থানীয় জাতের ধানও উৎপাদনে অবদান রাখছে। জেলা অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় দশকে জমির পরিমাণে বড় পরিবর্তন না হলেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কৃষকরা একই জমিতে নিবিড় চাষাবাদ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফলন বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। তবে কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে নেওয়া, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং তিন ফসলি জমি কমে যাওয়া বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে ফসলের নিবিড়তা ছিল ২০২ শতাংশ তা কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ শতাংশে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জাতীয় অর্থনীতিকে জানান, এই অঞ্চলে এখনও অনেক পতিত জমি রয়েছে যা চাষের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। আগামী মৌসুমে ৩০ থেকে ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা ইতিবাচক হলেও কৃষিজমি সুরক্ষা, অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনা এবং সমন্বিত কৃষিনীতি ছাড়া এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।


