বর্তমান যুগকে অনেক আলেম ‘ফিতনার যুগ’ বলে আখ্যা দেন। চারদিকে বিভ্রান্তি, মতবিরোধ, নৈতিক অবক্ষয় এবং সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সঠিক পথ চেনা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জ্ঞান বাড়ালেও একই সঙ্গে মিথ্যা, অপসংস্কৃতি ও সন্দেহের বীজ দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজের ঈমান অটুট রাখা এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকা।
ইসলামে ধৈর্য কিংবা সবর একটি মহান গুণ। এটি শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি হলো আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকা, গোনাহ থেকে বিরত থাকা এবং বিপদের সময় আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা। কোরআনে বারবার ধৈর্যের কথা বলা হয়েছে এবং ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ ফিতনার সময়ে ধৈর্যই একজন মুমিনকে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে। সবচাইতে বড় কথা হচ্ছে আল্লাহ তাদের সঙ্গেই থাকেন যারা ধৈর্য ধরে থাকতে পারে। অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ ধৈর্যধারণকারীর সঙ্গে আছেন।’
ফিতনার যুগে ধৈর্যের প্রথম স্তম্ভ হলো সঠিক জ্ঞান অর্জন। যখন মানুষ কোরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান থেকে দূরে সরে যায়, তখন সে সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হয়। তাই একজন মুমিনের উচিত নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা এবং তা নিজের জীবনে প্রয়োগ করা। জ্ঞানই মানুষকে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাব, কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ আয়াত ছিল জ্ঞানসংক্রান্ত। আর তা হচ্ছে একটি মাত্র শব্দসম্বলিত আয়াত: ‘পড়ো।’
দ্বিতীয়ত, ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা অত্যন্ত জরুরি। নামাজ, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত- এসব ইবাদত মানুষের অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং তাকে ফিতনার প্রভাব থেকে রক্ষা করে। যখন একজন বান্দা নিয়মিত আল্লাহর স্মরণে থাকে, তখন তার অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি সৃষ্টি হয়, যা তাকে যেকোনো বিপদে স্থির থাকতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে বলা হয়: ‘আর তোমরা সালাত এবং ধৈর্যের মাধ্যমে সাহায্য (আল্লাহর) প্রার্থনা কর।’
তৃতীয়ত, সৎ সঙ্গ নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তার সঙ্গীর দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদি সে এমন মানুষের সঙ্গে থাকে যারা দ্বীনের পথে চলে, তাহলে তার জন্য সৎ পথে থাকা সহজ হয়। পক্ষান্তরে, খারাপ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে ভুল পথে নিয়ে যায়। তাই একজন মুমিনের উচিত এমন পরিবেশ বেছে নেওয়া, যেখানে ঈমান ও আমল শক্তিশালী হয়। এ বিষয়ে কোরআনের নির্দেশনা হলো, ‘হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।’ আমাদের নবীজির (সা.) ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম সফল হয়েছিল চার খলিফা এবং অন্য সৎ সঙ্গীদের কল্যাণে। তাঁর ওফাতের পরও ইসলামের অগ্রযাত্রা থেমে থাকেনি তাদের আন্তরিকতা ও সাহসিকতার কারণে।
চতুর্থত, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং তওবার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। ফিতনার যুগে গোনাহ সহজলভ্য হয়ে গেছে, কিন্তু একজন সচেতন মুমিন নিজেকে সংযত রাখে। যদি ভুল হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এই তওবা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে।
সবশেষে, একজন মুমিনকে সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। পৃথিবীর পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর সাহায্য সবসময় তার বান্দাদের সঙ্গে থাকে। ধৈর্য, দোয়া এবং দৃঢ় ঈমান একজন মানুষকে সব ধরনের ফিতনার মধ্যেও অটল রাখতে পারে।
অতএব, ফিতনার এই কঠিন সময়ে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ধৈর্য ধারণ করা, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা, ইবাদতে অবিচল থাকা এবং সৎ সঙ্গ বজায় রাখা। এই গুণগুলোই তাকে বিভ্রান্তির অন্ধকার থেকে রক্ষা করবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করবে।
- শাহেদ হারুন
ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


