ডিজেল সংকটে সেচ খরচ বাড়ছে কৃষকের
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: দেশের শস্যভাণ্ডার খ্যাত হাওর অঞ্চলের জেলা কিশোরগঞ্জে এখন বোরো ধানের মাঠ গাঢ় সবুজে ছেয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু হাওরে ধান কাটা শুরু ও হয়েছে। কিন্তু কৃষকের এই রূপালি স্বপ্নে হানা দিয়েছে ডিজেলের 'কৃত্রিম' সংকট।

ভরা সেচ মৌসুমে যখন গাছের গোড়ায় পানি থাকা অপরিহার্য, তখনই জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট শুরু হয়েছে।

কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটার প্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও তেলের দোকানগুলো সুকৌশলে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই অরাজকতায় সেচ খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বোরো উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের জেরে সরকার জ্বালানি সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় দেশজুড়ে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। বিভিন্ন রকমের শাকসবজি তরি তরকারি, পেঁয়াজ, ভুট্টা ধানসহ অন্যান্য ফসলে পানি দিতে না পেরে ব্যাহত হচ্ছে সেচ কার্যক্রম, যা বোরো চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় খুচরা বাজার থেকে ডিজেল রীতিমতো উধাও। দীর্ঘ সময় লাইন ধরে দোকান থেকে দোকানে ঘুরছেন কৃষকরা।

দাঁড়িয়ে থেকেও চাহিদা মতো জ্বালানি মিলছে না. কারণ ডিজেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হাওরঞ্চলে রয়েছে ডিজেলের ভয়াবহ সংকট। প্রায় সব এলাকাতেই সেচ কাজে ডিজেল সংকটে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলসহ ১৩টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রধানত ইরি-বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন। ধান চাষে যান্ত্রিকীকরণ ও সমলয় পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদন খরচ ও সময় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অজুহাতে এখানে স্থানীয় সিন্ডিকেট ডিজেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ২০ শতাংশ তেলের দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। খোলা থাকা দোকানগুলোতে ১১৫ টাকার তেল ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কটিয়াদি উপজেলার করগাও ইউনিয়নের ব্যবসায়ী সজিব জানান, গত এক সপ্তাহে ডিপো থেকে মাঝারি ব্যবসায়ীরা ডিজেল পাননি। মজুত শেষ হওয়ায় হয়তো আর তেলই দিতে পারবেন না।

সদর উপজেলার মহিনন্দ এলাকার কৃষক বাবুল আক্তারের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল লুকিয়ে ফেলে দোকান বন্ধ রেখেছে, যাতে সংকট তীব্র হলে আরও বেশি দামে বিক্রি করা যায়। তেলের অভাবে সেচ ব্যাহত হওয়ায় লাভের বদলে এখন লোকসানের পাল্লাই ভারি হওয়ার উপক্রম।

শ্যালো মেশিন মালিক মোবারকসহ কয়েকজন জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও পাম্প থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে মাত্র ৫ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। ডিপো থেকে সরবরাহ কম। দাম বেশি হওয়ায় তারা তেল আনতে পারছেন না।

এদিকে নিকলী হাওরের কৃষকদের স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে।

কৃষক জুয়েল মিয়া জানান, এক লাখ টাকা ঋণ দিয়ে তিন একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 'দোকানে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। খালি বোতল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। পানির অভাবে ধান গাছের গোড়ায় মাটি শুকিয়ে গেছে, লালচে ভাব ধরেছে।

বর্তমানে বিধি-নিষেধের কারণে একজন ক্রেতা মাত্র দুই লিটার জ্বালানি কিনতে পারছেন।

অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগে খুচরা দোকানগুলোতে প্রতি লিটারে বাড়তি ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও তো কোথাও কোথাও আবার ৫০ থেকে ১০০ টাকায় উঠেছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭৫৪টি ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প সচল রয়েছে। দেশের প্রধান ধান বোরোর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা এবার ধরা হয়েছে ৫০ দশমিক ৫৪ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে ৪৮ দশমিক ৫৩ লাখ হেক্টরে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে।

—জা.অর্থনীতি/এনজে