সিআরবি নিয়ে দোদুল্যমানতা, মাঠে সরব নাগরিকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক সিআরবি এলাকায় প্রস্তাবিত হাসপাতাল নির্মাণ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তবে আগের সরকারের সময়ে করা চুক্তি এবং বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য সমাধান খোঁজার কথা জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সিআরবি এলাকায় ‘রেলওয়ের প্রস্তাবিত হাসপাতাল প্রকল্পের স্থান’ পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) চুক্তি হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি ডিপোজিটও জমা দিয়েছে।

“এখন সেই বিষয়টির একটি সমাধানে যেতে হবে। তবে কী ধরনের সমাধান হবে, তা সবার সঙ্গে আলোচনা করেই নির্ধারণ করা হবে,” বলেন মন্ত্রী।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি নিয়ে বর্তমান সরকার নতুন করে কাজ শুরু করার বা পুনরুজ্জীবিত করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেয়নি।

তবে মন্ত্রীর সফরের খবর প্রকাশের পর রোববার সকালে সিআরবি সাত রাস্তার মোড়ে মানববন্ধন করে ‘সিআরবি রক্ষা পরিষদ’। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যরা এতে সংহতি জানান।

পরিষদের আহ্বায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, সিআরবি একটি ঘোষিত হেরিটেজ এলাকা—এখানে কোনো বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়।

“আগেও আন্দোলনের মুখে সরকার সরে গিয়েছিল। এবারও জনগণ এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিহত করবে,” বলেন তিনি।

তিনি বিকল্প হিসেবে পাহাড়তলীর পরিত্যক্ত হাজ ক্যাম্প বা কুমিরা টিবি হাসপাতাল এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব দেন।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সিআরবিতে গাছ কেটে কোনো হাসপাতাল বা স্থাপনা নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।

আজ সকালে জামালখানে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এটা চট্টগ্রামবাসী কখনো মেনে নেবে না।”

মেয়র জানান, এ বিষয়ে রেলমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে এবং পুরনো রেলওয়ে হাসপাতাল সংস্কার করে উন্নত করার বিকল্প ভাবনা রয়েছে।

সিআরবি এলাকায় প্রায় ৬ একর জমিতে হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব প্রথম আসে ২০১৩ সালে। পিপিপি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। পরবর্তীতে একই বছরের ১৮ মার্চ ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রকল্পের আওতায় ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ এবং ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

তবে ২০২১ সালে প্রকল্পের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে টানা ৪৮০ দিন আন্দোলন চলে।

শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে সরকার সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ থেকে সরে আসে এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে।

এদিকে বর্তমান সরকারের সময় প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা সামনে আসতেই চট্টগ্রামে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সংগঠন বেসরকারি হাসপাতাল প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে।

সব মিলিয়ে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রশ্নে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। সরকার একদিকে আগের চুক্তির সমাধান খুঁজছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের প্রবল বিরোধিতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

—জা.অর্থনীতি/এনজে