বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাচার

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: দেশে ২৪ জেলার ওপর দিয়ে চলছে তাপপ্রবাহ। কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। কিন্তু ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে লোডশেডিংয়ে নাকাল জনজীবন। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গত সপ্তাহে বাড়তি ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। তবে বাড়তি ভর্তুকি তো পরের বিষয় নিয়মিত ভর্তুকি নিয়ে স্বেচ্ছাচার শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

সূত্র মতে, মার্চ মাসের জন্য কমপক্ষে ৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দরকার ছিল। অথচ অর্থ মন্ত্রণালয় মাত্র ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে এ ভর্তুকি শুধুমাত্র বেসরকারি খাতের বিতর্কিত রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। হাসিনার সময়ের বিতর্কিত এসব কেন্দ্রে ভর্তুকি বহাল রাখলেও গুরুত্বপূর্ণ ও বড় (বেসলোড) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভর্তুকি বন্ধ করে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এছাড়া এক খাতের বা কেন্দ্রের ভর্তুকি অন্য খাতে স্থানান্তর না করতে কড়াকড়ি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় ১২ টাকার কাছাকাছি। তবে ফার্নেস অয়েলের দাম সম্প্রতি ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধির পর এ ব্যয় ১২ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। যদিও বিদ্যুতের বাল্ক বিক্রয়মূল্য সাড়ে ৬টার মতো। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে ঘাটতি থাকছে সাড়ে ৫ টাকার মতো। মার্চে সেচ মৌসুম শুরুর পর বিদ্যুতে ঘাটতি বেড়ে গেছে। গত মাসে ৪ হাজার কোটি টাকার মতো ভর্তুকি দরকার ছিল। এ জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে অর্থ বিভাগে ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।

যদিও এতে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং চাহিদার মাত্র অর্ধেক ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। আবার ভর্তুকির জন্য একগাদা শর্ত জুড়ে দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাকি ঘাটতি পিডিবির বিদ্যুৎ বিক্রির আয় তথা রেভিনিউ থেকে পূরণ করতে বলা হয়েছে। তা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিক্রির আয় দিয়ে ঘাটতি পূরণ করা গেলে ভর্তুকি চাওয়ার দরকার হতো না।

তারা আরও বলেন, সবসময়ই চাহিদার তুলনায় ভর্তুকি কম দেওয়া হয়। তবে স্বাভাবিকভাবে ভর্তুকি পেলে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া আগে পরিশোধ করা হয়। দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সর্বোচ্চ স্বাভাবিক রাখতে ও লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি করা হয়। তবে এবার ভর্তুকি দেওয়ার সময় অর্থ মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বরাদ্দ দেয়নি। এমনকি কম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের ভর্তুকি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে স্থানান্তরে কঠোর বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে হয়তো একটি গোষ্ঠী সরকারকে পরিকল্পিতভাবে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে।

২১ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে পাঠানো চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালী তিনটি বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এর মধ্যে পায়রা ও রামপাল পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। এতে কেন্দ্র দুটি থেকে ২ হাজার ৪৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন না থাকায় এ দুই কেন্দ্রের ভর্তুকি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না থাকলে এ দুই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ এত বছর ধরে কীভাবে কেনা হচ্ছে। এ দুই কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গত অর্থবছর গড়ে ব্যয় হয়েছে ১৪ টাকার মতো। ভর্তুকি না দেওয়া হলে পিডিবির রেভিনিউ দিয়ে সাড়ে ৬ টাকা পরিশোধ সম্ভব। বাকি অর্থ কোথা থেকে আসবে। আর ভর্তুকি দেওয়া না হলে কেন্দ্র দুটির কয়লা আমদানি ব্যাহত হতে পারে। এতে কেন্দ্র দুটি বন্ধ হলে লোডশেডিংয়ের কি অবস্থা হবে তা কল্পনার বাইরে।

এদিকে কয়লাভিত্তিক পটুয়াখালীর (আরপিসিএল-নরিনকো) ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফার্নেস অয়েলচালিত বিআর-পাওয়ার জেন ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ভর্তুকি চাওয়া হলেও তা অনুমোদন করেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্টীকরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কয়লা সংকটে পটুয়াখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মাত্র ২৫০ থেকে ৩৫০ মেগাওয়াট চলছে। ভর্তুকি থেকে কয়লা কেনার বিল না দেওয়া হলে এ কেন্দ্রটির সক্ষমতার বড় অংশই বসে থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না বলে শর্ত দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বা উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন না থাকায় এ দুই কেন্দ্রের ভর্তুকি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এত বছর ধরে ক্রয় কমিটির অনুমোদন নিয়েই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। এখন অর্থ বিভাগ এটা কেমন শর্ত দিল তা পরিষ্কার নয়।

তাদের তথ্য মতে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে কেনা ২৫০ মেগাওয়াটে ভর্তুকি লাগে না। বাকি ৯১০ মেগাওয়াট ও আদানির ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনায় নিয়মিতই ভর্তুকি দেওয়া হয়। এখন ভর্তুকির অভাবে ভারতের এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ঘাটতিতে পড়তে হবে। এর সঙ্গে পায়রা ও রামপাল যোগ করলে ঘাটতি দাঁড়াবে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকির অভাবে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে এ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে তার কোনো উপায় কি অর্থ মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। তাদের মতে, ঘাটতি থাকলেও পিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি বাতিল করা হয়েছিল হাসিনা সরকারের সময়ই। এটা এখনও বহাল রাখা হয়েছে। অথচ হাসিনার সময় করা বিতর্কিত চুক্তির রেন্টাল ও বেসরকারি আইপিপিতে ভর্তুকি থাকছে বহালতবিয়তেই। এখন ভর্তুকি না পেলে কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নামবে বিপর্যয়, অন্ধকারে ডুববে দেশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি পিডিবির কোনো কর্মকর্তা। পরে বিদ্যুৎ সচিব ফারজানা মমতাজকে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দিয়েও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।