নৌ-অবরোধ বহাল রেখেই যুদ্ধবিরতি বাড়ালেন ট্রাম্প
  • অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহের অভিযোগে ইরানের ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
  • ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ জানিয়েছেন, অবরোধ তুলে নিলেই ইসলামাবাদে বৈঠক হতে পারে
  • দীর্ঘ যুদ্ধে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ অর্ধেক শেষ হওয়ার তথ্য দিয়েছে গবেষণা সংস্থা সিএসআইএস
  • হরমুজে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় বের করতে লন্ডনে জরুরি বৈঠকে বসছে ৩০টি দেশ

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক

কয়েকদিন ধরে টানা হুমকি-ধমকি দেওয়ার পর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের অনুরোধে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি। ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী ইরান একটি ‘সমন্বিত শান্তি প্রস্তাব’ নিয়ে না আসা পর্যন্ত হামলা স্থগিত থাকবে। তবে বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকছে।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হয়ে যায়। এই অবস্থায় ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে।

এদিকে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের ঠিক আগে মার্কিন অর্থ বিভাগ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচিতে সহায়তার অভিযোগে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে ‘ইকোনমিক ফিউরি’ বা অর্থনৈতিক ক্রোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থের উৎস পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া।

হরমুজ উত্তপ্ত, লন্ডনে বৈঠক

হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করা এবং সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উপায় বের করতে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বৈঠকে বসেছে প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশ। ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে গতকাল বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ২ দিনের বৈঠক। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সামরিক পরিকল্পনাবিদ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনা কর্মকর্তাদের। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৫০টি দেশ হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মিশনের সদস্য হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স।

গত সপ্তাহে এক ডজনেরও বেশি দেশ জানিয়েছে যে, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে তারা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক মিশনে যোগ দিতে ইচ্ছুক। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৫০টি দেশ হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স নেতৃত্বাধীন প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক মিশনের সদস্য হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স।

এদিকে, মার্কিন নৌ-অবরোধের জবাবে ইরানও কঠোর অবস্থানে গিয়েছে। গতকাল বুধবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি বিদেশি কনটেইনার জাহাজে গুলি ও রকেট হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এর ফলে বিশ্ব তেল বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। লাইবেরিয়া ও পানামার পতাকাবাহী এসব জাহাজে আইআরজিসির গানবোট থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ না সরলে এই জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ যেতে দেওয়া হবে না।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি সাফ জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বন্দর থেকে অবরোধ তুলে নেয়, তবেই তারা ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসবে। তিনি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত আবার রাজনৈতিক সমাধানের জন্যও প্রস্তুত।’ তবে ইরানের আধা-সরকারি সংস্থা তাসনিম নিউজ দাবি করেছে, ওয়াশিংটন তাদের ‘অযৌক্তিক দাবি’ থেকে সরে না আসায় ইরান আলোচনায় না বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সম্প্রতি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা সিএসআইএস জানিয়েছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শক্তিশালী প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ধেকই ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের টান পড়েছে। অন্যদিকে ইরানের ভেতর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের প্রায় ১ হাজার ৩০০ বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই যুদ্ধকে ‘অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়’ হিসেবে দেখলেও পরিস্থিতি এখনও ঘোলাটে। হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবে রকেট হামলা চালিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফরও বর্তমান অস্থিরতায় স্থগিত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি বৃদ্ধির ঘোষণায় সাময়িক বিরতি এলেও অবরোধ আর পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখনও যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত রয়েছে।