নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: পতিত সরকারের রেখে যাওয়া বিদেশি ঋণের বোঝা আরও বেড়েছে। বিদায়ী বছরের শেষ তিন মাসে তা ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ১০৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ গত বছর বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৯ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও শেষ ছয় মাসে বিদেশি ঋণ কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের জুন শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৯২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ১৯ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার, যা ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে সরকারি খাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৪ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার ও বেসরকারি খাতে ১৯ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার।
দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৬ সাল শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দশকে ৯৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে বিদেশি ঋণের বোঝা। সূত্রমতে, ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সিংহভাগই ছিল সরকারি খাতের ঋণ। এর পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার।
পরবর্তী দুই বছরে বিদেশি ঋণ বেড়ে যায় ৩৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৮ সাল শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতের ঋণ ছিল ২১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতের ছিল ১ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরের পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পায় ৩৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে এ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। ওই পাঁচ বছরেও সবচেয়ে বেশি ঋণ বেড়েছে সরকারি খাতের ঋণ। এ সময় সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার বেড়ে বিদেশি ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতের ঋণ ২ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার।
ওই পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৯ সালে বিদেশি ঋণ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন বাড়লেও, ২০১০ সালে তা প্রায় ৮৩৬ মিলিয়ন ডলার হ্রাস পায়। তবে পরের বছর তা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বাড়ে। যদিও ২০১২ ও ২০১৩ সালে বিদেশি ঋণ বাড়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার করে।
২০১৪ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ সরকার। পরের পাঁচ বছরে (২০১৪-২০১৮ সাল) দ্রুত বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পায়। ওই পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পায় ৭৯ দশমিক ৫১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সাল শেষে বিদেশি ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বিদেশি ঋণ বাড়ে ২৫ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার।
সে পাঁচ বছরে সরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে ১৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে ২০১৮ সাল শেষে এ খাতের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছিল ৪৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। ওই পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি পায় ৮ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সাল শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ স্থিতি ছিল ১২ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
ওই পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালেই বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পায় ৫ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। তবে পরের বছর তা মাত্র ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার বাড়ে। ২০১৬ সালে বিদেশি ঋণ বাড়ে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, ২০১৭ সালে রেকর্ড ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ও ২০১৮ সালে ৫ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদে বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৬ শতাংশের বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৫৭ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সাল শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের তৃতীয় মেয়াদে বছরের বিদেশি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।
ওই সময় সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার। আর বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ২০ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে শুধু সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পায় ৯ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন আর বেসরকারি ঋণ বাড়ে ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা-পরবর্তী বছর বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা ছিল। তখন বিদেশি ঋণের সুদহার অনেক কমে যায়। ওই সময়ে ডলারের চাহিদাও কমে। এতে অনেক দেশ তখন ঋণ পরিশোধ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটে উল্টোটি। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সহায়তার মাধ্যমে ঋণের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়। ঋণ পরিশোধের শর্ত শিথিল করে। কম সুদ এবং সহজ শর্তের কারণে ব্যবসায়ীরাও বিদেশ থেকে প্রচুর ঋণ নিতে থাকেন। ফলে ২০২১ সালে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ বৃদ্ধি পায়।
অপরদিকে হাসিনা সরকার চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর শেষ ছয় মাসে বিদেশি ঋণ কিছুটা কমেছে। এতে ২০২৪ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১০৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। আর ড. ইউনূস সরকারের প্রায় ১৮ মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার।

