যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে পিছু হটলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মাঝেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়, ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্তগুলোর ওপর তেহরানকে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সেখানে পৌঁছায়নি। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকদের একাংশ এক কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখছেন, যেখানে উভয় পক্ষই আলোচনার টেবিলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে।

তেহরানের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পিছু হটা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানি নেতাদের বিশ্বাস, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা তাদেরই বেশি। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও তেহরান তাদের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ দীর্ঘ সময় সহ্য করতে প্রস্তুত। বিপরীতে, ইরান কর্তৃক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এবং বিশেষ করে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে চাপের সৃষ্টি হয়েছে, তা ট্রাম্প দীর্ঘ সময় মোকাবিলা করতে পারবেন না বলে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে।

হরমুজ প্রণালি বর্তমানে প্রায় স্থবির থাকায় বিশ্বব্যাপী তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, কারণ এখান দিয়েই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হতো। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি গ্যাস ও সারের অভাব বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম আসন্ন নির্বাচনের বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, ইরান এই সংকটকে মাসের হিসেবে পরিমাপ করলেও ট্রাম্পের জন্য এটি কয়েক সপ্তাহের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা তাকে আলোচনার শর্ত শিথিল করতে বাধ্য করতে পারে।

এদিকে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনার পরিবেশ নষ্ট হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী। তারা অভিযোগ করেছেন যে, ট্রাম্প অবরোধ তুলে নিতে অস্বীকার করেছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি একে ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও প্রচার করছে, যেখানে মার্কিনিদের হুমকির বিপরীতে ইরানি অনড় অবস্থানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তেহরানের সাফ কথা—তারা নিষেধাজ্ঞা নিষ্ক্রিয় করার কৌশল ভালোভাবেই জানে এবং কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।

যদিও ইরানি শাসকগোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া, তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত দেশটির সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে। অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি দেশজুড়ে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষক আলী ওয়ায়েজ সতর্ক করেছেন যে, ইরানি নেতৃত্ব নিজেদের টিকে থাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মাশুল হবে ভয়াবহ। একদিকে মার্কিন সামরিক চাপ এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ মোকাবিলা করা ইরানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে পরাজিত হতে রাজি নয়।

জেএ/অভি