সমাজের কাঠামোকে ক্ষয় করে এবং মানবিক সম্পর্ককে দূষিত করে এমন সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দোষগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, জালিয়াতি এবং বিভিন্ন ধরনের কৌশলী প্রতারণা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক কাঠামো নিয়ে এসেছে, যা সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততাকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করে এবং দ্বিচারিতা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোরতম সতর্কবাণী প্রদান করে। যে ব্যক্তি গভীরভাবে কোরআন, নববী শিক্ষাগুলো এবং জ্ঞানীদের বাণী নিয়ে চিন্তা করে, সে দেখতে পাবে যে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার নিন্দা এই ধর্মের অন্যতম প্রধান নৈতিক অগ্রাধিকার।
কোরআনের মানদণ্ডে প্রতারণা
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘অসৎ চক্রান্ত কেবল তার পরিকল্পনাকারীদেরই ঘিরে ফেলে।’ (সুরা ফাতির, ৪৩) এই মহিমান্বিত আয়াত একটি স্থির বিধান প্রতিষ্ঠা করে: মন্দ কৌশল শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির ওপরই ফিরে আসে, যে এটি পরিকল্পনা করে। প্রতারক মনে করে সে নিখুঁত ফাঁদ পেতেছে, কিন্তু আল্লাহ এমন ব্যবস্থা করেন যে সেই ফাঁদই তার পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি শুধু পরকালের শাস্তির হুমকি নয়— এটি দুনিয়ার একটি বাস্তব নিয়ম, যা যুগে যুগে ব্যক্তি ও জাতির
ইতিহাসে প্রতিফলিত হয়েছে।
আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের কাজ সফল করেন না।’ (সুরা ইউনুস, ৮১) প্রতারণা এক ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করে, কারণ এটি আস্থাকে ধ্বংস করে— যা প্রতিটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি। যে কাজ প্রতারণা ও বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তা বাহ্যিকভাবে যতই সফল মনে হোক না কেন, আল্লাহ তার মধ্যে বরকত দান করেন না।
নবীজির (সা.) স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা
নবীজির একটি বিখ্যাত বাণী: ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’ (সহিহ মুসলিম)— সংক্ষিপ্ত হলেও এই বাণী অত্যন্ত গভীর তাৎপর্য বহন করে। প্রতারণা একজন মানুষকে নবীর আদর্শিক অনুসারীদের পূর্ণ পরিসর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটি এই দোষের গুরুতর অবস্থা স্পষ্ট করে।
প্রতারণা ও ভেজাল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে নবীজি (সা.) কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি নিজে বাজারে গিয়ে পণ্য পরীক্ষা করতেন। উল্লিখিত সহিহ মুসলিমের বিখ্যাত হাদিসে বর্ণিত আছে, একদিন তিনি একজন খাদ্যবিক্রেতার শস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরে ভেজা মাল লুকানো, উপরে শুকনো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ‘এটা কী?’ বিক্রেতা বৃষ্টির কারণ দেখাল। নবীজি (সা.) বললেন: ‘তাহলে ভেজা অংশ উপরে রাখলে না কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত?’— তারপর উচ্চারণ করলেন সেই চিরন্তন বাক্য: ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’
উমর ইবনুল খাত্তাবও (রা.) এই সুন্নাহ অনুসরণ করে মদীনার বাজারে নিয়মিত টহল দিতেন এবং অসৎ ব্যবসায়ীদের শাস্তি দিতেন— যা ইবনে সাদের তাবাকাতুল কুবরা-তে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত।
নবীজি (সা.) আরও বলেছেন: ‘আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাক এবং যা বাধ্যতামূলক করেছেন তা পালন কর— তবে তুমি প্রকৃত জ্ঞানী হবে।’ (বায়হাকি)
এই বাণী বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতার একটি সুন্দর সমন্বয় তুলে ধরে: প্রকৃত জ্ঞানী সে নয়, যে চাতুর্য ও কৌশলে পারদর্শী; বরং সে, যে নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকে এবং কর্তব্য পালন করে। বাস্তবে প্রতারণা এক ধরনের মূর্খতা— কারণ এটি আল্লাহর অসন্তোষ ডেকে আনে এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইসলাম শুধু প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতার নিন্দা করেই থেমে থাকেনি— বরং এর পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ভিত্তি সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা এবং স্বচ্ছতা। কোরআনে বলা হয়েছে: ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা-১১৯)
একজন আন্তরিক বিশ্বাসীর কোনো কৌশল বা প্রতারণার প্রয়োজন নেই, কারণ সে জানে প্রকৃত বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, মানুষের কৌশল থেকে নয়— এবং চূড়ান্ত সফলতা সেসব মানুষের জন্য, যারা আল্লাহভীরু; প্রতারকদের জন্য নয়।
শাহেদ হারুন,ইসলামি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

