বিপন্ন জনস্বাস্থ্য, নির্বিকার সরকার

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বিদ্যুৎ বা ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার। কেবল অলিগলি নয়, ঝুঁকি নিয়ে চলছে মহাসড়কেও। ইজিবাইক ও ব্যাটারি রিকশা নামে পরিচিত এই বাহন চলেও বেপরোয়া। এসব গাড়ির কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে, যা পথে নামলে যে কেউ দেখতে পারেন। কিন্তু এই বাহন নীরবে ও অগোচরে মানুষের স্বাস্থ্য ও প্রতিবেশের যে ক্ষতি করছে, তা ভয়াবহ। ইজিবাইকের ব্যাটারিতে বিষাক্ত সিসা স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশের জন্য তৈরি করছে মারাত্মক ঝুঁকি। এক দশক ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও বিগত সরকার ছিল অনেকটা নির্বিকার; ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিদ্যুচ্চালিত থ্রি-হুইলারের (ইজিবাইক ও রিকশা) ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সিসা, সিসা অক্সাইড ও সালফিউরিক অ্যাসিড। এর মধ্যে সিসা সবচেয়ে বিষাক্ত উপাদান। বিশ্বে মোট সিসা ব্যবহারের প্রায় ৯০ শতাংশই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এটি পরিবেশ দূষণের একটি বড় উৎস। সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। অল্প পরিমাণ সিসাও শিশুদের বিকাশমান মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

সিপিডির গবেষণায় দেখা যায়, দেশের পরিবহন খাতে সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির দখল ৭৮ শতাংশ, যা খুবই উদ্বেগজনক। সিসা-আসিড ব্যাটারির ৭৬ শতাংশই বিদ্যুচ্চালিত ইজিবাইকে ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে সৌরগৃহ ব্যবস্থাপনায় ৭ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলে ৫ শতাংশ, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্যাক্সির ব্যাটারিতে ৪ শতাংশ, টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে ৩ শতাংশ এবং একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ট্রাক-ট্রাক্টর-অ্যাম্বুলেন্সে ২ শতাংশ এবং বাসের ব্যাটারিতে ১ শতাংশ সিসা অ্যাসিডের ব্যবহার করা হয়।

গবেষণা সংশ্লিষ্ট সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালিদ মাহমুদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, পরিবহনের ব্যাটারিতে সিসা ব্যবহারের পরিমাণ বড় উদ্বেগের। একটি নতুন ব্যাটারির দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা। ব্যাটারির মেয়াদ এক বছর বলা হলেও বাস্তবে আট থেকে দশ মাসের বেশি চলে না। যখন ব্যাটারিগুলো নষ্ট হয়ে যায় বা চার্জ কম দেয়, তখন চালকরা সেগুলো বিক্রেতার কাছে জমা দিয়ে প্রায় অর্ধেক দামে নতুন ব্যাটারি সংগ্রহ করেন। কিন্তু পুরোনো ব্যাটারি দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর উপায়ে পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।

সরকারি নিয়ম বা পরিবেশগত মান বজায় না রেখেই শতাধিক অবৈধ কারখানায় সিসা গলিয়ে ব্যাটারি পূর্ণ করার কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির মাত্র ২০ শতাংশ সঠিক ও নিয়মমাফিক পদ্ধতিতে পুনর্নবীকরণ করা হয়, বাকি ৮০ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিতভাবে সম্পন্ন হয়। সিসা গলানোর সময় নির্গত বর্জ্য পুকুর বা ফসলি জমিতে মিশে পানি ও ফসলকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। সিসা গলানোর সময় তৈরি ধোঁয়া মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এতে কারখানার আশপাশের মানুষ দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। দূষিত পানি, শাকসবজি, মাটি ও বাতাসের মাধ্যমে বিষাক্ত পদার্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে অপূরণীয় ক্ষতি করছে।’

গবেষণার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সিসা দূষণ পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। খুলনা, টাঙ্গাইল, পটুয়াখালী ও সিলেটে ৯শ’ ৮০ জন শিশু এবং ঢাকায় ৫শ’ জন শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে প্রত্যেকের শরীরেই সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, ওই চার জেলার ৪০ শতাংশ এবং ঢাকার ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। সারা দেশে ৩ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। জাতীয়ভাবে শিশুদের রক্তে সিসার গড় মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৬ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম এবং প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি শিশু সিসা বিষক্রিয়ায় ভুগছে। সিসা সংক্রান্ত রোগে প্রতি বছর বাংলাদেশে ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২৫ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সিসার সংস্পর্শের কারণে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দেশে বৈদ্যুতিক ও সিসাসমৃদ্ধ যন্ত্রপাতিগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো সঠিক নিয়ম নেই। ছোট-বড় সব ধরনের বিদ্যুৎ কোষ যেখানে-সেখানে ফেলার কারণে সিসা আমাদের খাবার ও পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ফসল ও মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকছে। এটি শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বাধা দেয় এবং বড়দের কিডনি ও লিভার বিকল করে দেয়। এটি ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি তৈরি করে। অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে অকালপ্রসব বা বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’

হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের এই পরিচালক বলেন, বৈদ্যুতিক ও সিসাসমৃদ্ধ যন্ত্রপাতিগুলো যারা মেরামত বা পরিষ্কার করেন, তাদের বিশেষ সুরক্ষামূলক পোশাক পরতে হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সুরক্ষিত স্থানে কাজ করতে হবে। বর্জ্য অপসারণের জন্য একটি সরকারি নীতিমালা থাকতে হবে, যা মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

পরিবেশ ও গবাদি পশুর ওপর সিসা-ব্যাটারি ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে সিপিডি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে জামালপুরে মাটি দূষণের কারণে প্রায় ৩০টি গরু মারা যায়। মাগুরা জেলার একটি গ্রামে সিসা দূষণের প্রাদুর্ভাবে ৫০টি গবাদি পশু মারা গেছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মাটি এতটাই দূষিত হয়েছে, মাটির রঙ বদলে গেছে এবং স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী কারখানার পাশের জমিগুলো তাদের উর্বরতা হারিয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, সিসা ব্যাটারির দূষণের হাত থেকে কৃষি জমিকে রক্ষা করা এবং ফসলের উৎপাদন যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতি বছর প্রায় ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার হয়ে চাষের আওতার বাইরে যাচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৫ শতাংশ জমি চাষের স্বাভাবিক গতির কারণে বা সাময়িকভাবে চাষহীন অবস্থায় পড়ে থাকছে।

সিসাযুক্ত ব্যাটারি ব্যবহারের বিকল্প খুঁজে বের করা জরুরি বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ব্যাটারি ব্যবহারের জন্য সঠিক নীতিমালা ও নির্দেশিকা প্রয়োজন এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সিসা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের অনেক কারখানা অনুমোদনহীনভাবে চলছে। কার অবহেলায় এগুলো বছরের পর বছর সচল আছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। সিসা আমদানির পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং এর বিকল্প নিয়ে কাজ করতে হবে।

রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান লিপনের হিসাবে, দেশে পরিবহনখাতের ব্যাটারি ব্যবসায় মোট ৬০ লাখ মানুষ সরাসরি যুক্ত। এর মধ্যে ৫০ লাখ বিদ্যুৎচালিত রিকশা, ভ্যান বা ছোট যানগুলোর চালক। বাকি ১০ লাখ মানুষ মিস্ত্রি, গ্যারেজ ও যন্ত্রাংশের মালিক ও চার্জ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় অর্থনীতিকে তিনি বলেন, ‘যদি প্রতি পরিবারে পাঁচজন সদস্য ধরা হয়, তবে প্রায় ৩ কোটি মানুষ সরাসরি এই আয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিশাল এই কর্মসংস্থানকে ব্যাহত না করে পর্যায়ক্রমে সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় আওতায় আনতে হবে।’

অতি সম্প্রতি ‘বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ ও ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০২৬’ নামে নীতিমালা করেছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের এই দুটি নীতিমালা খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, সারা দেশে সড়ক ও মহাসড়ক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সড়কের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জরুরি ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ, পরিবেশ বান্ধব ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (নীতি) জোহরা তারা বেগম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘নীতিমালা খসড়া প্রণয়নে মাত্র চারজন মতামত দিয়েছেন। খসড়ার কাজ চলমান রয়েছে। আরো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।’

নীতিমালা ব্যাটারি উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বলা হয়, মোটরযানে ব্যবহৃত মেয়াদ উত্তীর্ণ/অকেজো ব্যাটারি পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধি-বিধান ও গাইডলাইন অনুযায়ী পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে নিরাপদভাবে বর্জন করতে হবে। পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের উদ্দেশ্যে ব্যাটারি সংগ্রহ ও ভাঙা বা আগুনে গলানোর কোনো কাজ করতে পারবে না। ইলেক্ট্রনিক ভেহিকেল (ইভি) শিল্প টেকসইকরণে ব্যাটারিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থসহ (যেমন, লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ইত্যাদি) ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়, ইলেকট্রিক মোটরযানে মূল বৈদ্যুতিক শক্তি সংরক্ষণের জন্য লিড অ্যাসিড/লিথিয়াম আয়ন অথবা অধিকতর উন্নত ও পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ছাড়া অন্য কোনো ব্যাটারি ব্যবহার করা যাবে না। তবে পেক্ষাপট অনুযায়ী ইলেকট্রিক মোটরযানে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।